Saturday, October 20, 2007

সংকট

ফোনে সিন্ডির গলার স্বর অস্থির। কিছু তাড়াও আছে বলে মনে হয়। কিন্তু তার উচ্চারণ ঘন ও একাগ্র, কথা স্পষ্ট। সাওকাট, আই নীড টু স্পীক টু ইউ। তোমার কি সময় আছে? ইট’স ভেরি ইমপর্ট্যান্ট।

শওকত বলে, বেশ তো, বলো।

ফোনে নয়, সামনাসামনি বলতে চাই।

কখন, কবে বলো।

তোমার সময় থাকলে আজ রাতেই, এখনই।

আমার কোনো সমস্যা নেই।

তাহলে আমি তোমার ওখানে চলে আসতে পারি? আই মীন, তোমার যদি অসুবিধা না থাকে।

চলে এসো, কোনো অসুবিধা নেই।

আধঘণ্টার মধ্যে আসছি আমি।

ফোন রেখে শওকত কিঞ্চিৎ কৌতুক বোধ করে। এক হিসেবে সিন্ডিও এই অ্যাপার্টমেন্টের ভাগীদার, লীজের চুক্তিতে শওকতের সঙ্গে তার নাম আছে। তবু আসার জন্যে তাকে অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়! হাস্যকর বটে। লীজের কাগজে স্বাক্ষর থাকলেও সিন্ডি এখানে বসবাস করে না। কখনো করেনি, কথাও ছিলো না। কিন্তু কী কথা বলতে আসছে সিন্ডি? রাত এখন প্রায় এগারোটা, অসময় তো বটেই। সামান্য অস্বস্তি লাগে। উদ্বেগ হয়। ভালো খবর নিয়ে সে আসছে না, তা অনুমান করা যায় নিশ্চিন্তে। জরুরি কিছু হবে নিশ্চয়ই যা কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে না, ফোনেও বলা যায় না। বিষয়টা কি?

কাজ থেকে শওকত ফিরেছে সাড়ে ন’টায়। টিভিতে ডেভিড লেটারম্যানের লেট নাইট শো দেখছিলো সে। লেটারম্যান মজার লোক, মুচকি হাসি থেকে হো হো দমফাটানো হাসি-হাসানো সবই পারে সে। সেলিব্রিটিদের ইন্টারভিউ করতে গিয়ে উদ্ভট প্রশ্নে তাদের নাস্তানাবুদ করা লেটারম্যানের প্রিয় কীর্তি। তারপরেও তারা, বিশেষ করে উঠতি সেলিব্রিটিরা, এই অনুষ্ঠানে হাজির হওয়াকে গৌরবময় অর্জন বলে মনে করে। জানে, ভালোমন্দ যা-ই হোক, পরিচিতি কিছু বাড়াবে লেটারম্যান, যা শেষ পর্যন্ত কাজেই লাগবে তাদের। শো-বিজনেসে নেগেটিভ পাবলিসিটিও এক ধরনের পাবলিসিটি বটে, তাকে তুমি কীভাবে ভাঙিয়ে খেতে পারবে তা তোমার ব্যাপার।

ক্লাস এবং কাজের পরে দিনশেষে টিভি দেখা শওকতের একমাত্র আয়েশ। সাত বছর আগে এ দেশে এসেই টিভিতে আটকে গিয়েছিলো সে। দেশে থাকার কালে টিভি চ্যানেল ছিলো মোটে একখানা, তা-ও মাত্র কয়েকঘণ্টার। এখন তো দেশে নতুন নতুন চ্যানেল চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ দেশে বসেও স্যাটেলাইটে অনেকগুলো দেশী চ্যানেল দেখা যায়, অনেক বাড়িতে সে দেখেছে। তার আগ্রহ হয় না।
এ দেশে টিভি চ্যানেলের গোনা-গুনতি নেই, তার বেশিরভাগ দিবারাত্র চালু। একটি জিনিস শওকত বুঝে গিয়েছিলো, মার্কিনি ধাঁচের উচ্চারণে ও টানে ইংরেজি শিখে নেওয়ার সবচেয়ে সোজা পথ হলো প্রচুর টিভি এবং হলিউডি ছবি দেখা। বাক্যগুলো কীভাবে গঠিত হচ্ছে, একেকটা শব্দ উচ্চারণের সময় ঝোঁকটা কোথায় পড়ছে, মার্কিনি উচ্চারণের ধরণ - এইসব খেয়াল করা। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজে শেখা বৃটিশ ইংরেজির থেকে এখানকার ইংরেজি একেবারে অন্যরকম। প্রথম প্রথম বুঝতে বেশ অসুবিধা হতো। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গেলে কোনো ঝামেলা নেই, কিছু বানানের পার্থক্য ছাড়া ব্যাকরণ সেই একই। মুখে বলার ধরণ ও উচ্চারণ খুবই আলাদা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অকাতরে টিভি দেখা তাকে মার্কিনি ইংরেজিতে অভ্যস্ত করে তুলেছে। এ দেশীয়দের কায়দায় প্রায় নিখুঁতভাবে ইংরেজি বলা এখন পুরোপুরি শওকতের আয়ত্বে। এমনকি, কথা বলার সময় দরকারমতো কাঁধ ঝাঁকানো-টাকানোসহ।

ঢাকায় তাদের বসবাসের দুই পুরুষ চলছে, শওকত আর তার বড়ো দুই ভাইবোনের জন্মও ঢাকায়। অথচ বাড়িতে সামান্য ঢাকাইয়া মিশেল সহযোগে সিলেটের মৌলভীবাজার অঞ্চলের ভাষাই চলে। দেশের বাড়ির আত্মীয়-স্বজনরা এলে তাদের ঢাকার বাড়ি এখনো মৌলভীবাজার হয়ে যায়।

শওকতের পিতা সেনাবাহিনীতে ডাক্তার ছিলেন, কর্নেল হয়ে অবসর নিয়েছেন দু’বছর আগে। এখন প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, ফার্মগেটে নিজস্ব চেম্বারসহ ওষুধের দোকান। পশার ভালোই, বাংলাদেশে রোগীর অভাব কোনোকালে হওয়ার নয়। ফলে শওকতের পড়াশোনার খরচ দেশ থেকে পাঠাতে অসুবিধা কিছু হয় না। থাকা-খাওয়া বা আনুষঙ্গিক খরচও পাঠাতে ইচ্ছুক বাবা, যাতে তার পড়াশোনার ব্যাঘাত না ঘটে। শওকতের সংকোচ হয়। এ দেশের একেকটি ডলারের জন্যে বাংলাদেশের প্রায় সত্তর টাকা লাগে। জানে, বাবার সঙ্গতি আছে এবং চাওয়ামাত্র তিনি সানন্দে সে ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু শওকত নেবে কেন?

আমেরিকায় আসার পর থেকেই নিজে কাজ করে সে। টানাটানি হয় মাঝেমধ্যে, সেমেস্টার বাদ পড়ে যায়, তবু নিজের রোজগারে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিও আছে। আর বছরখানেকের মধ্যে পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। এরপরে দেশে গিয়ে সে স্থিত হবে, বাবা-মা দু’জনেরই বাসনা তাই। বড়ো ভাই আর্মিতে, তার পোস্টিং ঢাকার বাইরে। বোনটিরও বিয়ে হয়ে গেলো বলে। সুতরাং ঢাকার বাড়িতে অচিরে বাসিন্দা বলতে বাবা-মা ছাড়া আর কেউ থাকছে না। শওকতকে তাঁরা কাছাকাছি চান, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কর্তব্যপরায়ণ ও বাধ্য ছেলে হিসেবে প্রথম কয়েক বছর তার সম্পূর্ণ ইচ্ছে সেরকমই ছিলো। এখন আর সে ততো নিশ্চিত নয়।
ডেভিড লেটারম্যান শেষ হলে শওকত রিমোট চেপে চ্যানেল বদলাতে থাকে। হিস্ট্রি চ্যানেলে বার্লিন দেওয়াল নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। বার্লিনের দেওয়াল ভাঙার উৎসব। ধারাভাষ্যকার বলে যায়, দুই জার্মানির মধ্যে মানুষজনের যাতায়াত বন্ধের জন্যে এই দেওয়াল তোলা হয়েছিলো। পরিহাসের বিষয়, ইতিহাসের চক্রে ২৮ বছর পর তা ভাঙা হলো সেই যাতায়াতের সুবিধার জন্যেই।

আজ তার ক্লাস ছিলো না। কাজে গিয়েছিলো দুপুর একটায়, শেষ করে ফিরেছে একটু আগে। বেনিগ্যান’স নামের একটি আইরিশ-আমেরিকান রেস্টুরেন্টের কিচেন তার কর্মস্থল। এ দেশে আসার আগে সে রান্নাঘরে কোনোদিন ঢোকেনি। দরকার হলে বড়োজোর গরম পানি রান্না করার ক্ষমতা ছিলো বলে তার ধারণা, তা-ও করে দেখা হয়নি কখনো।

আমেরিকায় সে এখন ছাত্র এবং রন্ধনশালার কর্মী। মূল রন্ধনকর্মের জন্যে আছে শেফরা, তার কাজ প্রেপ করা। শওকত লক্ষ্য করেছে, আমেরিকানরা যে কোনো শব্দ সংক্ষেপ করায় খুবই পারদর্শী। প্রেপারেশনকে বানানো হয়েছে প্রেপ। সেদ্ধ করা মুরগির হাড় ছাড়িয়ে মাংস কুচি করে বা চৌকো করে কাটো, গোমাংসের কিমা পরিমাণমতো নিয়ে গোলাকৃতি চ্যাপ্টা প্যাটি বানাও স্টেক বা বারগারের জন্যে, আলু-পেঁয়াজ কেটে দাও, সালাদের জন্যে ফল-সবজি ও আনুষঙ্গিক সব তৈরি রাখো - শওকতের কাজ বলতে এই। সে একা নয়, ছ’সাত জোড়া হাত এই কাজ একনাগাড়ে করে যায়।

রেস্টুরেন্টে বাঙালি আরেকজন আছে, টিংকু। শেফের কাজ করে, সে-ই শওকতের কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো। ঠিক চাকরি দেওয়া নয়, বদলি করিয়ে আনা। চেইন রেস্টুরেন্ট বেনিগ্যান’স-এর যেটাতে শওকত প্রথম ঢুকেছিলো, বাসা থেকে সেখানে যেতে-আসতে ড্রাইভ করতে হতো ষাট-সত্তর মাইল। এখন যাওয়া-আসা মিলিয়ে পনেরো-ষোলো। অনেকটা সময় ও অধুনা দুর্মূল্য গ্যাসের খরচ বাঁচে। গাড়ির আয়ুও। তার টয়োটা করোলার বয়স তার এ দেশে বসবাসের বয়সের সমান, যদিও এর মালিকানা পেয়েছে সে বছর দুয়েক হয়। এর আগেরটা ছিলো নিসান সেন্ট্রা। বারো বছর বয়সী বুড়ো সেন্ট্রাকে এক সকালে আর ঘুম থেকে জাগানো গেলো না, ট্রান্সমিশন বসে গিয়েছিলো। সারানোর খরচ গাড়ির বাজারদরের সমান। পাঁচ বছর মেয়াদী মাসিক কিস্তিতে তখন শওকত অন্য কারো ব্যবহৃত এই করোলা কিনেছিলো। ব্যবহৃত অবস্থায় কেনা হলেও নির্ভরযোগ্য এখনো, শওকত গাড়ির যতœও করে, তবু বয়স হয়ে যাওয়া গাড়ির ভরসা নেই। যে কোনো সময় হয়তো বসে যাবে, এবং তাকে পথে বসাবে।

টিংকু আরেকটি কাজ করেছিলো শওকতের জন্যে। সিন্ডির সঙ্গে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সিন্ডি এখানকার হোস্টেস। খেতে আসা মানুষজনকে প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে বেনিগ্যান'স-এ স্বাগত জানানো এবং তাদের টেবিলে নিয়ে বসানোর কাজ তার। সিন্ডির বান্ধবী মিশেলকে বিয়ে করেছে টিংকু, তাদের এক বছর বয়সী একটি বাচ্চাও আছে। শওকত নিজে কখনো এদেশীয় মেয়েকে বিয়ে করবে না। তবু করতে হয়েছে, চুক্তির বিয়ে। টিংকুর মধ্যস্থতায় সিন্ডি দু’বছরের চুক্তিতে কাগজের বিয়ে করতে সম্মত হয় শওকতকে গ্রীনকার্ড পাইয়ে দেওয়ার জন্যে। দীর্ঘকালের বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সিন্ডির সম্প্রতি তখন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে তাদের জানাশোনা, বাগদানও হয়ে গিয়েছিলো। বিয়ের ঠিক আগে সিন্ডি বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করে তার বয়ফ্রেন্ডটি অবিশ্বস্ত, একাধিক মেয়ের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক রাখার প্রতিভাসম্পন্ন। এই আবিষ্কারে সিন্ডি বড়ো রকমের একটি ধাক্কা খায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় কখনো বিয়েই করবে না সে।

টিংকু আর মিশেল দূতিয়ালির কাজটি করে, দু’জনে সিন্ডিকে বুঝিয়ে বলেছিলো, এটা সত্যিকারের বিয়ে নয়, শুধুই কাগজপত্রে। একসঙ্গে বসবাসের প্রশ্নও নেই, আর শওকত যে ধরনের লাজুক ছেলে, সে কোনোদিন হাতটিও ধরতে চাইবে না। গ্রীন কার্ডের জন্যে কেবলমাত্র কাগজপত্রে দেখাতে হবে যে তারা বিবাহিত, তাদের যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে এবং অ্যাপার্টমেন্টের লীজ কনট্রাক্টে দু’জনের নাম আছে। কাউন্টি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিসে যে বিয়েটি হবে তা শুধুই একটি কাগজে সই করার বেশি কিছু নয়। আর ইমিগ্রেশন অফিসে বার দুয়েক যেতে হবে ইন্টারভিউয়ের জন্যে।

সহকর্মী হিসেবে শওকতের সঙ্গে সিন্ডির খানিকটা বন্ধুত্বমতো আগেই ছিলো। সিন্ডি রাজি হয় বন্ধুর উপকারটি করতে। টাকাপয়সা বা অন্য কোনো লেনদেনের ব্যাপার নেই। তার নিজের কিছু এসে যায় না। কোনো লোকসান কিছু নেই, শওকতের এ দেশে থাকার কাগপত্রের যদি একটা গতি হয়ে যায়, ক্ষতি কি? আর সে নিজে বিয়ে করবে না বলে ঠিক করেছে। মাত্র বছর দুয়েকের ব্যাপার, শওকতের গ্রীনকার্ড হয়ে গেলে কাগজে সই করে ছাড়াছাড়ি করে নিলেই হলো। কাগজের বিয়ে কাগজেই শেষ। সিন্ডি একটিমাত্র শর্ত, এই খবর যেন আর কারো কানে না ওঠে। সামাজিকভাবে তা ভালো দেখায় না। আর ইমিগ্রেশন ঘুণাক্ষরেও টের পেলে শওকতকে বড়োজোর ডিপোর্ট করবে, কিন্তু তাকে জেলে যেতে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী বছর দেড়েক আগে কাগজে-কলমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ইমিগ্রেশনে শওকতের জন্যে আবেদনও করে আসে সিন্ডি। শওকতের অস্থায়ী গ্রীনকার্ড হয়ে আছে। আর মাস ছয়েকের মধ্যে ফাইনাল ইন্টারভিউয়ের জন্যে ডাকবে, ইমিগ্রেশন মামু সন্তুষ্ট হলে তবে স্থায়ী গ্রীনকার্ড।

টিভিতে চোখ থাকলেও শওকতের অস্বস্তি বাড়ে। ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। এরকম উদ্বিগ্ন গলায় ফোন আগে কোনোদিন করেনি সিন্ডি। এমনিতে কাজের বাইরে কথাবার্তা তেমন হয়ও না, হঠাৎ কোনো কারণে সিন্ডি বারকয়েক ফোন করেছে, এ বাসায় এসেছেও। এই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়ার সময় লীজের কাগজে সই করতে এসেছিলো, আগের বাসা থেকে এখান উঠে আসার সময় শওকতের জিনিসপত্র টানাটানির সময় টিংকু-মিশেলের সঙ্গে সে-ও হাত লাগিয়েছে। শওকতের জন্মদিনে টিংকু আর মিশেলের সঙ্গে এসেছিলো সর্বশেষ। সেদিন তাদের দু’জনের একত্রে কিছু ছবি তুলে দিয়েছিলো টিংকু। বলেছিলো, ছবিগুলো রাখিস, বড়ো মামুর লগে তোর ইন্টারভিউয়ের সময় কামে লাগবো। টিপুর পরামর্শে একটি ছবিতে শওকতকে সিন্ডির কাঁধে হাত রেখে গালে গাল লাগাতে হয়। অস্বস্তি হয়েছিলো, এই প্রথম কোনো অনাত্মীয় মেয়ের শরীরের এতো ঘনিষ্ঠ হওয়া তার। কাগজে-কলমে হলেও সিন্ডি তো সত্যি সত্যি তার বউ নয়। কোনো দুর্বলতা জন্মায়নি, এই মেয়েটি তার সত্যিকারের বউ হলে কেমন হতো, তা-ও মনে আসেনি। বিয়ে করা বউ হলেও সিন্ডি বাইরের মানুষ, বউ নয়।

দরজায় টোকা পড়ার আগে বসার ঘরটি একটু ভদ্রস্থ করবে ভেবেছিলো। টিভিতে বার্লিনের দেওয়াল দেখতে দেখতে ভুলেই গেলো। ঘর গোছানোর দরকার খুব একটা ছিলো, তা নয়। ব্যাচেলর একটি ছেলের ঘর ছবির মতো গোছানো হওয়া সম্ভব নয়। কেউ হয়তো তা আশাও করে না। এককালে নাকি মেয়েরা - মা, ভাবী-বউদি, এমনকি প্রেমিকা - মৃদু অনুযোগ ও কপট বকুনিসহ ব্যাচেলরদের ঘরটর গোছানোর কাজটি সম্পন্ন করে দিয়ে যেতো। কিন্তু কাগজের বিয়ে মানে সংসারী হওয়া নয়, এই বউয়ের কাছে সেসব আশা করা চলে না। বউ নিজের ঘরে আসছে ফোন করে অনুমতি নিয়ে - তা-ও শুধু কাগজের বিয়েতেই হওয়া সম্ভব।

ঘরে ঢুকে সিন্ডি হাতব্যাগটি পাশে রেখে সোফার ওপরে ধপ করে বসে। কে জানে কেন এই প্রথম শওকত অনুভব করে, মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী। আগে এরকম মনে হয়নি কেন? পায়ের গোড়ালি পর্যšত নামানো সাদা স্কার্টের সঙ্গে পরেছে লাল রঙের ব্লাউজ। কাঁধ পর্যন্ত নামানো সোনালি চুলগুলি সামান্য এলোমেলো। তার মুখচোখ খানিকটা বিপর্যস্ত। শওকত সাবধানে জিজ্ঞাসা করে, কেমন আছো, সিন্ডি?

ভালো না।

তোমাকে খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে, কী হয়েছে?

সেটা বলতেই আসা। গলাটা শুকিয়ে আছে, একটু পানি পেতে পারি?

নিশ্চয়ই। পানি খাবে, নাকি কোক?

সিন্ডি একটু ম্লান হাসে, যে কোনো একটা হলেই চলে।

শওকত গ্লাসের আধাআধি পর্যন্ত ভরে ফেলে বরফের টুকরো দিয়ে। ফ্রিজ থেকে কোকের ক্যান বের করে গ্লাসে ঢালে। খানিকটা ঢেলে থামতে হয়, ক্যানে আবদ্ধ কোকের বুদবুদ গ্লাস ভরিয়ে দিয়েছে। তাকিয়ে বুদবুদগুলোকে মিলিয়ে যেতে দেখে সে। তারপর আবার ঢালে।

গ্লাসে ছোটো চুমুক দিয়ে সিন্ডি বলে, আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু তোমার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিটা আমি রাখতে পারছি না, সাওকাট।

শওকত জানে, সিন্ডি কোন প্রতিশ্রুতির কথা বলছে। ওই কাগজের বিয়ে ছাড়া আর কোনো দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার নেই তাদের। সে চুপ করে থাকে।

আরেক চুমুক কোক গলায় নামিয়ে সিন্ডি বলে, আমি জানি ব্যাপারটা তোমার জন্যে ভালো হচ্ছে না। তোমার কাগজপত্রের ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলে আমি খুবই খুশি হতাম। কিন্তু আশা করি তুমি বিশ্বাস করবে যে আমার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু সিন্ডি, ব্যাপারটা আর মাত্র মাস ছয়েকের। তুমি খুবই বন্ধুর মতো আমার উপকার করতে চেয়েছিলে, তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। এতোদূর পর্যন্ত এসে সামান্য সময়ের জন্যে সব ওলটপালট করে দেওয়াটা কেমন অর্থহীন হয়ে যায় না?

জানি সাওকাট। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ব্যাপারটা চুকে যেতো। কিন্তু আমি সত্যিই অপারগ।

শওকত একটু চুপ করে থেকে বলে, বেশ তো, তাহলে কী করতে চাও বলো।

বিয়েটা অ্যানালমেন্ট করাতে হবে। ডিভোর্স নয়, অ্যানালমেন্ট।

মানে?

ডিভোর্স হলে সেটা সারাজীবন আমার রেকর্ডে থেকে যাবে। যদিও এটা কোনো বিয়ে ছিলো না এবং শুধু একজন বন্ধুকে সাহায্য করতে যাওয়া ছাড়া যে আর কিছু নয়, এই কথা কেউ বুঝবে না। আসলে জানানোও যাবে না। কাকে বলবো, কীভাবে ব্যাখ্যা করবো? বললে কে বিশ্বাস করবে? যদি তোমার সঙ্গে আমার সেরকম একটা ভালোবাসার সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যেতো, আমরা সত্যিকারের দম্পতির মতো ঘরসংসার করতাম, তাহলে না হয় কথা ছিলো। তখন তাকে আর মুছে ফেলার কথা উঠতো না। হয়তো আমরা চাইতাম না, চাইলেও পারা যেতো না। তা তো হয়নি। এখন অ্যানালমেন্ট করলে ভবিষ্যতের এই যন্ত্রণা আমাকে পোয়াতে হয় না। শুধু আমি কেন, তুমি এ দেশে বাস করতে চাইলে ওই ডিভোর্স তোমাকেও সারাজীবন ভোগাবে।

কফি টেবিলে রাখা সিন্ডির কোকের গ্লাস দেখে শওকত। সেখানে আর কোনো বুদবুদ উঠতে দেখা যায় না। অর্ধেক গ্লাস নিরেট কোক। চুপ করে থাকে সে। কী বলবে? কী বলা যায়?

সিন্ডি বলে, অ্যানালমেন্টটা সেরে ফেলতে হবে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু তুমি জানতে চাও না কী এমন হলো যে আর ছ’টা মাস আমি অপেক্ষা করতে পারছি না?

কারণ নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, তোমার কাছে তার ব্যাখ্যাও আছে। ইচ্ছে হলে বলবে, না হলে নয়। পুরোটাই তোমার ব্যাপার।

বন্ধু হিসেবেও জানতে চাইতে পারতে।

তা পারতাম। কিন্তু তুমি জানো, আমি কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনো কৌতূহল দেখাই না। উচিতও মনে করি না। ইচ্ছে হলে বলতে পারো, আমার শুনতে আপত্তি নেই।

তুমি কি খুব রেগে যাচ্ছো?

শওকত মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ফলাফল যা হয় তাকে মলিন মুখের হাসি বলা চলে বড়োজোর। বলে, যা হওয়ার তা হবে, রাগ করবো কেন?

এক চুমুক কোক খায় সিন্ডি। বলে, তোমাকে বলবো বলেই এসেছি। না হলে ফোনেই আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারতাম। বললে আশা করি তুমি বুঝবে, সিদ্ধান্তটা আমাকে কেন নিতে হলো।

বলো, শুনি।

তিন মাস আগে এক পার্টিতে একটি ছেলের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। আমরা দেখা করতে শুরু করি। পরস্পরকে পছন্দের ব্যাপার ঘটে। প্রেমও। স্টিভ আমাকে বিয়ে করতে চায়। তোমার ব্যাপারটা ভেবে বিয়ে পিছিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলাম। ওকে বলেছি, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। স্টিভ নাছোড়বান্দা, একটুও অপেক্ষা করতে চায় না। একদিন অবুঝের মতো বলতে লাগলো, আমাকে ভালোবাসলে বিয়ে করতে চাও না কেন? আর আমাকে নিয়ে স্টিভ এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভোগে বলেও মনে হয়, আমাকে সে হারাতে চায় না।
আমিও ওকে খুবই ভালোবাসি।

একটু থেমে সিন্ডি কোকের গ্লাসে ছোটো একটা চুমুক দেয়। শওকতের বলতে ইচ্ছে হয়, এই তুমিই কখনো সংসার পাতবে না ঠিক করেছিলে, তার কী হলো? বলে আর কী লাভ! সে চুপ করে থাকে।

সিন্ডি নিজেই তার ব্যাখ্যা দেয়, আমার আগের বয়ফ্রেন্ডের কথা তুমি জানো। তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বিয়ে সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমি সেই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি, সত্যি বলতে কি স্টিভের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। এখনকার এই বিশ্বাস, এই অনুভূতিটাও আমি আর হারাতে চাই না। ওকে আমি সত্যিই খুব ভালোবাসি। আশা করি তুমি বুঝতে পারছো, সাওকাট।

শওকতের অনেক প্রশ্ন মনে আসছে। ইমিগ্রেশনের কাজ মিটিয়ে তখন কি অ্যানালমেন্ট করার উপায় থাকতো? ঝামেলা নিশ্চয়ই হতো। অ্যানালমেন্ট করা বিয়ের সুবাদে পাওয়া গ্রীন কার্ডও বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। গত দুই বছর বিবাহিত দম্পতি হিসেবে দুজনের একত্রে ট্যাক্স ফাইল করা হয়েছে, ইমিগ্রেশনের কাছে বিয়েটা আরো বিশ্বাসযোগ্য করার জন্যে। তার কী হবে? অ্যানালমেন্টে তা মুছবে না। এখন এসব বলার কোনো মানে নেই আর, শওকত জানে।

সে আস্তে করে বলে, বুঝতে পারছি। মিশেল-টিংকু জানে?

না, ওদের সঙ্গে এখনো কথা বলিনি। ওরা খুবই আশ্চর্য হবে আমি জানি। তাতে কিছু এসে যায় না। ক্ষতি যা হওয়ার, তা তোমারই। আশা করি তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না। তোমাকে সাহায্য করতে পারলে আমি খুবই খুশি হতাম, কিন্তু হলো না। আমাকে ক্ষমা করো, সাওকাট।

মন খারাপ কোরো না, সিন্ডি। তোমার সাধ্যমতো চেষ্টা তুমি করেছো। বন্ধুরা তাই করে। তোমার জীবন, তোমার ভবিষ্যতের চিন্তা তোমাকেই করতে হবে। নিজের জন্যে যেটা সবচেয়ে ভালো হয়, তাই তোমার করা উচিত।

আমি শুধু ভাবছি, তোমার এখন কী উপায় হবে?

একটা কিছু হয়ে যাবে, ভেবো না। না হলে দেশে ফিরবো। ফিরে যাওয়ার রাস্তা তো খোলা আছেই।

সিন্ডি কোকের গ্লাসে শেষ চুমুক দেয়। বলে, কিন্তু তুমি এ দেশে থাকতে চেয়েছিলে। এখন আমি কি তোমার জন্যে অন্য কোনো মেয়েকে খুঁজবো?

না, ধন্যবাদ। তার দরকার নেই।

সিন্ডি উঠে দাঁড়ায়। শওকতও। সিন্ডি বলে, তোমার সময় হলে পরশু আ্যনালমেন্টের সই-সাবুদের ব্যাপারটা সেরে ফেলতে চাই।

ঠিক আছে, তাই হবে।

কখন কোথায় আসতে হবে, আমি তোমাকে কাল ফোন করে জানিয়ে দেবো।

কাল সন্ধ্যায় ফোন কোরো, তখন ঘরে থাকবো।

সিন্ডি করমর্দনের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আমরা কি এখনো বন্ধু থাকতে পারি?

শওকত সিন্ডির বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে, নিশ্চয়ই।

সিন্ডি এগিয়ে এসে শওকতকে আলতো আলিঙ্গন করে। দরজা খুলে বাইরের ল্যান্ডিং-এ দাঁড়ায়। বলে, একটা কথা বলি। ইচ্ছে হলে বিশ্বাস করতে পারো, না-ও পারো।

বলো।

সাওকাট, তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি। তুমি একটিবার চাইলে স্টিভ কেন, আর কাউকেই আমার দরকার ছিলো না। তুমি কোনোদিন ফিরেও দেখলে না, আমি কিন্তু অপেক্ষায় ছিলাম। শুধু কাগজে নয়, তুমি একবার চাইলে আমি সত্যি সত্যিই তোমার হতে পারতাম।

সিন্ডি বিদায় নেওয়ার অনেক পরে একা ঘরে শওকতের মনে হলো, বার্লিনের দেওয়াল উঠেছিলো কেন? ভেঙে ফেলা হবে বলেই তো।

No comments: