Showing posts with label স্মরণ-বরণ-বিস্মরণ. Show all posts
Showing posts with label স্মরণ-বরণ-বিস্মরণ. Show all posts

Sunday, July 27, 2008

স্বপ্ন-জাগরণের মাঝখানে

পিতৃপুরুষের গ্রামের বাড়ি দোগাছি থেকে ফোন। কান্না-জড়ানো গলায় খোকা ভাই জানালেন, দাদা এইমাত্র মারা গেলেন।

কী বলবো, কী করবো বুঝতে না পেরে হতভম্বের মতো ফোন ধরে আছি। ভাবছি, সবাইকে খবরটা কীভাবে দেওয়া উচিত। ফোনে খোকা ভাই কীসব যেন বলে যাচ্ছেন, আমার মস্তিষ্কে তার কিছুই প্রবেশ করে না। না শোক, না দুঃখবোধ – কিছুই টের পাই না। শুধু মনে হয়, দাদা মারা গেলেন!

ঘুম ভেঙে যায়। ভোর হতে এখনো ঢের বাকি। বিছানায় উঠে বসি। বুঝি, স্বপ্ন দেখছিলাম। তখনো মনে মনে ভাবছি, দাদা মারা গেলেন!

বিছানা থেকে নামি। বাথরুমে যাই ঘুমচোখে। ফিরে ঘুমিয়ে পড়ার আগেও ভাবছি, দাদা মারা গেছেন।

সকালে অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙলে প্রথমেই মনে আসে, দাদা মারা গেছেন।

দাঁত মাজা শেষে চোখেমুখে পানি দিয়ে ঘোর কাটে। মনে পড়ে, দাদা মারা গেছেন আজ নয়, প্রায় তিরিশ বছর আগে!

অক্টোবর ১৩, ২০০৫

Monday, July 21, 2008

একে একে নিভিছে দেউটি - এবারে কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক


এইমাত্র পাওয়া খবর, কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হক আর নেই। কয়েক ঘণ্টা আগে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন।

হৃদরোগের চিকিৎসাশেষে মাহমুদুল হক মাত্র তিন-চারদিন আগে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছিলেন আপাত-সুস্থ হয়ে, নিজে পায়ে হাঁটতে সক্ষম অবস্থায়। কিন্তু জীবন কী অনিত্য!

আজকের অনেক পাঠকের কাছে মাহমুদুল হক খুব পরিচিত নন। বরাবর কম লিখতেন, ইদানিং প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন লেখালেখি। ষাটের দশকের এই দিশারী লেখকের কাছে আমরা জীবন আমার বোন, নিরাপদ তন্দ্রা-র মতো অসামান্য উপন্যাস পেয়েছি।

ভালো কোনো খবর আজকাল আর পাওয়া হয় না। কীভাবে যেন যাবতীয় দুঃসংবাদ আমার কাছে দ্রুত এসে পড়ে। ব্যক্তিগত পরিচয় মাহমুদুল হকের সঙ্গে আমার ছিলো না, তবু ব্যতিক্রম হলো না।

----------------------------------
জুলাই ২০, ২০০৮। সন্ধ্যা ৭:২০
----------------------------------

Thursday, May 8, 2008

রবীন্দ্রসংগীতের শক্তি : আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি রচনা

১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগে এটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সর্বশেষ রচনা। প্রথমে লেখা হয় ৯৬-এর ৮ ডিসেম্বর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ঢাকা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের বার্ষিক সম্মেলনের জন্যে লিখিত বক্তব্য হিসেবে। অসুস্থতার জন্যে ইলিয়াস উপস্থিত হতে না পারায় লেখাটি সেখানে পাঠ করে শোনানো হয়। পরে বদরুদ্দীন উমরের ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশে লেখক সম্মতি দিয়ে জানান, তিনি আরো কিছু কথা সংযোজন করতে চান। তখন তাঁর আর নিজে লেখার অবস্থা নেই, ডান হাত ভাঙা। ডিকটেশন দেবেন, গলা ও ফুসফুসের সমস্যায় কথা বলায়ও সমস্যা। তারপরেও এই রচনায় আরো কিছু সংযোজন তিনি করতে পেরেছিলেন। ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো নিচের ভাষ্যটি।

রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে লেখা বাংলা ভাষার আরেকজন প্রধান (এবং প্রয়াত) লেখকের এই রচনাটি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। তাই তুলে আনা।


তথাকথিত পাকিস্তানি সংস্কৃতির অজুহাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা কখনো স্তিমিত হয়নি। বরং সরকারি প্রচারমাধ্যমগুলো রাজনীতি প্রচার ও সংস্কৃতিচর্চায় কোনোরকম ভূমিকা পালন করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। নইলে ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্ভব হল কী করে? সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় সরকারি রক্তচক্ষু বিঘ্নের সৃষ্টি তো করতে পারেইনি বরং শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের রুখে দাঁড়াবার জন্য প্ররোচিত করেছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে পাশ্চাত্যের ব্যান্ড মিউজিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায় রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা বেড়েছে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করা কিংবা ছোট করার অপচেষ্টা এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষিত মানুষের সমর্থন পায়নি, এখনও পায় না।

এটা রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিশেষ কোনো অনুরাগ বা ভক্তির নিদর্শন নয়। রবীন্দ্রনাথের গানের প্রধান আবেদন ব্যক্তির কাছে। এই আধুনিক ব্যক্তি যে-সমাজে গড়ে ওঠে, আমাদের দেশে সেই সমাজ এখন নির্মীয়মান। নানা কারণে এ-সমাজে ব্যক্তির বিকাশ স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক হচ্ছে না। এই সমাজগঠনের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র। কিন্তু বিদেশি সাহায্য সংস্থাসমূহের রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ, তাদের পরোক্ষ উস্কানিতে ধর্মান্ধ অপশক্তির উৎপাত প্রভৃতির কারণে রাষ্ট্র যেমন শক্ত হতে পারে না, ব্যক্তির স্বাভাবিক বিকাশেও তেমনি পদে পদে বিঘ্ন ঘটে।

রবীন্দ্রচর্চায় মাঝে মাঝে যে বিঘ্নের সৃষ্টি করা হয় তার কারণ কিন্তু তথাকথিত পাকিস্তানি সংস্কৃতি নয়। বরং সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট ধর্মান্ধদের উৎপাত। এই উৎপাত কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন এইসব ইতর লোকদের বিরুদ্ধে একটু সংঘবদ্ধ হলেই এরা গর্তে ঢুকে পড়ে।

সিংহভাগ শিক্ষিত মানুষের রাজনৈতিক মতামত যা-ই হোক-না কেন, একটি আধুনিক সমাজের সদস্য হওয়ার জন্য তারা উদগ্রীব। সুতরাং পঙ্গু হোক, রুগ্ণ হোক, ব্যক্তির বিকাশ এখানে কোনো-না-কোনোভাবে ঘটেই চলেছে।

এই ব্যক্তির একান্ত অনুভব সবচেয়ে বেশি সাড়া পায় রবীন্দ্রসংগীতে। তাই এই পঙ্গু বা রুগ্ণ ব্যক্তিটিকে বারবার যেতে হয় তাঁর গানের কাছেই।

রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যে-ব্যক্তিকে তিনি শক্তসমর্থ মানুষ। আমাদের পঙ্গু ব্যক্তি রবীন্দ্রসংগীতে নিজেকে শনাক্ত করতে চায় শক্ত মানুষ হিসেবে। হয়তো এই দেখাটা ভুল কিন্তু এই ভুল দেখতে দেখতেই সে একদিন শক্ত একটি ব্যক্তিতে বিকশিত হতেও তো পারে। তখনই গড়ে ওঠে ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্ববান মানুষ দায়িত্বশীল, সে কেবল নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ থাকতে পারে না। তাই তার চারদিকের মানুষের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে ওঠে। রাশিয়ার চিঠিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণে কোনো ভ্রান্তি ছিল না। অসাধারণ শক্তিমান মানুষ যে-কোনো জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও মঙ্গল দেখে সন্তুষ্ট হতে বাধ্য।

বাংলাদেশেও ব্যক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছে। এবং শক্তসমর্থ ব্যক্তিগঠনে এই গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রবীন্দ্রনাথের গান মানুষকে বিপ্লবের দিকে উদ্বুদ্ধ করবে না। কিন্তু শক্তসমর্থ ব্যক্তিগঠনে রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষমতা অসাধারণ। শক্ত মানুষের সমবেত শক্তি মানববিরোধী অচলায়তন ভাঙার অন্যতম প্রেরণা তো বটেই।

* * * * * * * *

লেখাটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ৩ থেকে নেওয়া হয়েছে।

Saturday, January 26, 2008

গল্পের শেষ যেভাবে : প্রস্থানোদ্যত আমাদের কালের একজন নায়ক

প্রিয় নান্নু ভাই, আমাকে আপনি চেনেন না। চেনার কথা নয, কোনো উপলক্ষ কখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। তবু আপনাকে ভাই সম্বোধন করলাম কেন? কারণ আমি আপনাকে চিনি অনেককাল ধরে। আপনি সেই প্রজাতির মানুষ যাঁকে লক্ষ মানুষ চেনে এবং তাদের অনেকেই আপনাকে ঠিক আমার মতোই খুব কাছের মানুষ বলে জানে। আরেকটি কারণ সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে। আপনার ছোটো ভাই মঞ্জুর সঙ্গে মাস ছয়েক আগে অনেকটা আকস্মিকভাবেই পরিচয়, কিছু ঘনিষ্ঠতাও। তিনি আমার প্রায় সমবয়সী, আমরা পরস্পরকে নামসহ ভাই সম্বোধন করি। মঞ্জু ভাইয়ের স্ত্রী হাসিন ভাবী আমার স্ত্রীর বন্ধু। সুতরাং আপনাকে ভাই ডাকার এক ধরনের অধিকারও আমার জন্মে গেছে।

আপনি পড়েছিলেন কি না জানি না, আপনাদের দুই ভাইকে নিয়ে লেখা একটি গল্প ছাপা হয়েছিলো ১৯৭৮ সালে। তখন আপনারা দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডানের অধিনায়ক। ঘটনাটি ঐতিহাসিক, দুই সহোদর বড়ো দুই দলের অধিনায়কত্ব করছেন এমন ঘটনা বাংলাদেশ আর কখনো ঘটেনি। সে বছর মৌসুমের শুরুতে আপনারা দুই ভাই দুই বিপরীতমুখী ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৭৭-এর অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর অধিনায়ক আপনি বললেন, শিরোপা ধরে রাখবো। মোহামেডানের দলনেতা মঞ্জু ভাই জানালেন, শিরোপা আমরা নেবো। সে বছর মোহামেডান লীগ-চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো। আপনি পরাস্ত হলেও গর্ব করে বলতেই পারেন, সেই চ্যাম্পয়নশীপ আপনাদের পরিবারেই ছিলো!

১৯৭৮-এ আবাহনী-মোহামেডানের খেলার আগে সহোদর দুই অধিনায়কের করমর্দন

আবাহনী-মোহামেডানের খেলার দিন ‘স্টেডিয়াম’ পত্রিকায় ওই গল্পটি ছাপা হয়। আপনার জানার কথা নয়, আজ জানাই, ‘সেই প্রতিশ্রুতি’ শিরোনামের গল্পটির রচয়িতা ছিলাম আমি। গল্পের কপি আমার কাছে নেই, পুরো গল্পটিও মনে নেই। আবছামতো যতোটুকু মনে পড়ে তা অনেকটা এইরকম : আজ আবাহনী-মোহামেডানের খেলা। দুই দলের অধিনায়ক নান্নু ও মঞ্জু একই বাড়ির বাসিন্দা – দুই সহোদর। সকালে নান্নুর ঘুম ভাঙে স্বপ্ন দেখে, আজকের খেলা নিয়েই একটি স্বপ্নদৃশ্য। গোলমুখ থেকে বলটি হঠাৎ উধাও, যা শুধু স্বপ্নেই সম্ভব। দুই ভাই পরস্পরের শত্রুপক্ষ। আজ এই সকালে তাদের কারো মনে পড়ে অথবা পড়ে না, বাল্যকালে তারা জীবনভর একই দলে খেলবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলো।

আপনার হয়তো মনে আছে, ‘স্টেডিয়াম’-এর মালিক-প্রকাশক আবাহনীতে আপনার সতীর্থ আরেক খেলোয়াড় টুটুল। নামে পাক্ষিক হলেও কাগজটি অনিয়মিত বের হয়। তবে বড়ো খেলার দিনে অবশ্যই একটি সংখ্যা বাজারে আসে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার দশেক কপি নিঃশেষ হয়ে যায় স্টেডিয়ামের বাইরে এবং গ্যালারিতে। এর সম্পাদক তখন আবদুর রহমান, গেট-আপ মেকাপ ও ইলাস্ট্রেশনে আফজাল হোসেন। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, ওই সময় আফজাল টিভিতে তার ‘আপনপ্রিয়’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে আপনাদের দুই ভাইকে উপস্থিত করেছিলো।

১৯৭৮ : বিটিভি-তে ‘আপনপ্রিয়’ অনুষ্ঠানে আফজাল হোসেনের সঙ্গে নান্নু ও মঞ্জু

উয়ারি এলাকার সপ্তর্ষি মুদ্রায়ণে ‘স্টেডিয়াম’ কম্পোজ কাজ হয়, ছাপাখানাটি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের কর্মকর্তা নজরুল ভাইয়ের, পত্রিকার অফিস হিসেবে সেখানে একটি ঘরও তিনি ব্যবহার করতে দিয়েছেন। মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতে যাই সেখানে। এরকম এক আড্ডায় রহমান ও আফজাল অকস্মাৎ দাবি করে বসে, আবাহনী-মোহামেডানের খেলা উপলক্ষে পরিকল্পিত সংখ্যার জন্যে একটি গল্প লিখে দিতে হবে। কেন এই বুদ্ধি তাদের মাথায় এলো জানি না, ৮৩ সালে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই কাগজের আয়ুষ্কালে এর আগে বা পরে দ্বিতীয় কোনো গল্প আর ছাপা হয়নি। এই তথ্যটি সম্পর্কে আমি নিশ্চিত এইজন্যে যে, গোড়া থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে একটা সম্পর্ক আমার ছিলো, ৮০ থেকে ৮৩ পর্যন্ত ‘স্টেডিয়াম’-এর যে ক’টি সংখ্যা বেরিয়েছিলো তার সম্পাদনার দায়িত্ব ছিলো আমার।

নান্নু-মঞ্জু দুই ভাই দুই দলের অধিনায়ক, সেই খেলার দিনে গল্পের বিষয় হিসেবে এর চেয়ে ভালো আর কী হয়! খেলা দেখে আপনাদের চিনি, ব্যক্তিগত জীবন প্রায় কিছুই জানি না। দু’জনের পুরো নাম জানি – মনোয়ার হোসেন নান্নু ও শামসুল আলম মঞ্জু। আপনাদের পারিবারিক জীবন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি কিছুই জানা নেই। কিন্তু গল্পের জন্যে তথ্য খুব জরুরি নয়। যতোদূর মনে পড়ে, ওই অফিসে বসেই গল্পটি লেখা হয় এবং আফজাল তৎক্ষণাৎ ইলাস্ট্রেশনও করে ফেলে।

‘স্টেডিয়াম’ যথাসময়ে প্রকাশিত হলো, স্টেডিয়ামে খেলাও শুরু হলো। খেলার শুরুতে মাঝমাঠে রেফারি এ লাইনসম্যানদের সামনে নিজ নিজ দলের অধিনায়ক হিসেবে আপনারা দুই ভাই করমর্দন করছেন, এই মুহূর্তটি এখনো চোখে ভাসে। এই লেখাটির সঙ্গে দেওয়ার জন্যে সেই ছবির একটি কপি মঞ্জু ভাইয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা গেলো।

আমি জানি, আপনি ভোলেননি যে সেদিনের খেলা অসমাপ্ত ছিলো। আবাহনী-মোহামেডানের খেলায় চিরাচরিত গোলযোগ নয়, প্রবল বৃষ্টিতে খেলাটি অমীমাংসিত অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়। আমার লেখা গল্প-সম্বলিত পত্রিকার কপিগুলিও রক্ষা পায়নি অনুমান করি, বৃষ্টিতে ধুয়ে গিয়ে থাকবে। সেখানেই গল্প আটকে থাকতে পারতো, পরিত্যক্ত ও অসমাপ্ত খেলাটির মতো। প্রায় তিরিশ বছরের ব্যবধানে সেই গল্পের উপসংহার আমাকে লিখতে হবে তা কি জানতাম!

সারাজীবন একসঙ্গে এক দলের হয়ে খেলার প্রতিশ্রুতি আপনাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বাল্যকালে হয়েছিলো কি না জানা নেই, লেখার জন্যে সেটি তৎক্ষণাৎ কল্পনা করে নিতে হয়েছিলো সেদিন। তেমন প্রতিশ্রুতির ঘটনা থাকলেও তাকে বালখিল্য বলে বিবেচনা করাই সঙ্গত। বাস্তবতা ছিলো এই যে, স্বাধীনতার পর আবাহনী ক্রীড়াচক্র গঠিত হলে মঞ্জু ভাই সেখানে অন্তর্ভুক্ত হন, আপনি তখন মোহামেডানে। ৭৪-এ আপনিও চলে এলেন আবাহনীতে। ঢাকা ফুটবল লীগে ১৯৭৪-এর একটিমাত্র বছর আপনারা এক দলের হয়ে খেলেছিলেন। জাতীয় দলে একসঙ্গে খেলা যদি হিসেবে ধরা না হয়, বাল্যকালে প্রতিশ্রুত হয়ে থাকলে তা বাস্তব হয়েছিলো এই একটি ফুটবল মৌসুমে।

১৯৭৫-এ দু’জনের পথ আলাদা হয়ে যায়, সে বছর মঞ্জু ভাই গেলেন মোহামেডানে, খেলোয়াড়ী জীবন তাঁর শেষ হলো ৮৫-তে। আর আপনি ৮২-তে অবসর নেওয়া পর্যন্ত থেকে যান আবাহনীতে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবলে একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাকিস্তান আমলে অন্য সবকিছুর মতো ফুটবলেও জাতীয় দলের হয়ে বাঙালির অংশগ্রহণ সীমিত ছিলো। ৭১-এ যুদ্ধের সময় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ভারতে অনেকগুলি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে স্বাধীনতার বার্তা তুলে ধরে এবং সেই অভিজ্ঞতা যে এক নতুন অনুভবের জন্ম দেয়, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ফুটবল নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠা এবং ইংল্যান্ড থেকে আসা আবাহনীর কোচ জন হার্ট পত্তন করে দিলেন সম্পূর্ণ নতুন ধাঁচের ফুটবল-শৈলীর।

১৯৭৮ : স্টেডিয়াম পত্রিকায় দুই অধিনায়কের যুদ্ধঘোষণা

আবাহনীর জন্মের পর থেকে আমি তার সমর্থক। অবশ্য আমি সেই জাতের সমর্থক যার পক্ষে মোহামেডান গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা ছিলো। সুতরাং দলানুগত্যের বাইরে থেকেও বলতে পারি, বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের শুরু আবাহনীর হাত ধরে। ক্রমশ অন্য দলগুলিও এই ধারা অনুসরণ করতে শুরু করে। ফুটবল তখন বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিলো, এই নবযাত্রায় তা আরো বেগবান হয়। আপনাদের প্রজন্মের ফুটবলাররা এর অনুঘটক ছিলেন, এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন বরে মনে হয় না।

শুধু খেলার ধাঁচ নয়, সেই সময়ের খেলোয়াড়দের চেহারা ও পোশাক-আশাকও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাঁধসমান লম্বা চুল নিয়ে দ্রুতগামী অশ্বের মতো কেশর দুলিয়ে খেলোয়াড়দের ঢাকার মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে এর আগে কে কবে দেখেছে! পৃথিবীর অন্যসব দেশে যেমন হয়, বাংলাদেশেও সালাউদ্দিন-নান্নুর মতো ঝাঁকড়া চুল রাখা এবং খেলোয়াড়দের ফ্যাশন অনুকরণ করার রীতি প্রচলিত হয়ে যায় তখন। ফুটবল ভদ্রলোকের খেলা নয় বলে সেই সময়ে সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণাও আপনারা ভাঙতে সক্ষম হলেন। খেলাপাগল মানুষ ও সমর্থকদের উন্মাদনা শুধু নয়, ফুটবল তখন এক ধরণের সামাজিক বিবর্তনের অনুঘটক হয়ে ওঠে। আমার পিতা খেলাধুলা বিষয়ে চরমতম উদাসীন মানুষ ছিলেন, তাঁকেও একসময় ফুটবল ও সালাউদ্দিনকে এক করে জানতে এবং মানতে হয়।

সংকীর্ণ রাজনীতি এবং ধারাবাহিক প্রশাসনিক ব্যর্থতায় আপনাদের হাতে শুরু হওয়া ফুটবলের উত্থান ও অগ্রযাত্রা আমরা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হয়েছি, তা অন্য প্রসঙ্গ।

খেলোয়াড়ী জীবনে আপনি খেলেছেন মধ্যমাঠে গেমমেকার হিসেবে এবং রক্ষণভাগে লেফট ব্যাক ও স্টপার হিসেবে। মঞ্জু ভাই রাইটব্যাক খেলেছেন বরাবর। খেলোয়াড় হিসেবে আপনারা দুই ভাই নিজেদের পজিশনে তাঁদের সময়ের এবং সম্ভবত বাংলাদেশ ফুটবলে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। অথচ খেলার স্টাইল ও মাঠ-ব্যক্তিত্বের বিচারে দু’জন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। আপনি স্থিতি ও প্রশান্ত মেজাজের প্রতীক, আপনার খেলা ধীর অথচ ঋজু কবিতার মতো শিল্পসুষমামণ্ডিত, মনোহর। মঞ্জু ভাই আপনার ঠিক বিপরীতে। তাঁর মাঠ-ব্যক্তিত্ব ছিলো কিছুটা রূঢ়, তীক্ষ্ণমেজাজী ও পৌরুষদীপ্ত। মাথা-গরম ফুটবলার হিসেবে মঞ্জু ভাইয়ের এবং তার অব্যবহিত পরে টুটুলের খ্যাতি (নাকি কুখ্যাতি!) ছিলো। আগে অন্যদের কাছে শোনা ছিলো এবং এখন পরিচয় হওয়ার পর দেখছি, মাঠের মঞ্জুর সঙ্গে এই মঞ্জুকে একদমই মেলানো যায় না। টুটুলের বেলায়ও এই ঘটনা দেখেছি।

রাইটব্যাক যে আক্রমণাত্মক খেলা খেলতে পারে, রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ও আক্রমণে সহায়ক হতে পারে মঞ্জু ভাইয়ের খেলায় দেখে ঢাকার দর্শক তা প্রথম প্রত্যক্ষ করেছিলো। এক অর্থে তা ছিলো এক ধরনের বিপ্লবাত্মক ঘটনা। মঞ্জু ভাই মোহামেডানে চলে গেলে আবাহনীতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন টুটুল, তিনিও মঞ্জু ভাইয়ের খেলার ধারাটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মনে পড়ছে, একবার একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে মঞ্জু ভাই বলেছিলেন, ৭৫ ও ৭৬-এ টুটুল যে খেলা খেলেছিলো তা ধরে রাখতে পারলে মঞ্জু নামে ঢাকার মাঠে কেউ যে কোনোদিন খেলেছিলো তা আর কেউ মনে রাখতো না। রূঢ় ও তীক্ষ্ণমেজাজী বলে পরিচিত মঞ্জু ভাই বলছেন এই কথা তাঁরই সমসাময়িক এবং একই পজিশনের খেলোয়াড় সম্পর্কে। বাংলাদেশে এই বিনয় খুব বেশি দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই।

১৯৭৪-এর আইএফএ শীল্ড টুর্নামেন্টের কথা আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। আবাহনী গেছে কলকাতায় খেলতে। তখন টিভিতে খেলা দেখানোর চল হয়নি। বিটিভি ছিলো, কিন্তু কলকাতায় দূরদর্শন সম্ভবত চালুও হয়নি তখনো। রেডিওতে ধারাবর্ণনা শুনছিলাম, আবাহনী খেলছে কলকাতার অন্যতম সেরা দল ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। দুর্দান্ত খেলেছিলো আবাহনী সেদিন। একসময় আকাশবাণীর ধারাভাষ্যকারকে যা বলতে শুনলাম তার বক্তব্যটি এরকম: ‘ঝাঁকড়া চুলের দীর্ঘদেহী বাংলাদেশের ছেলেটি মাঝমাঠে কাউকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, যেন এলাকাটি তার একান্ত নিজস্ব’।

ওই ধারাবর্ণনা আপনি শোনেননি, তখন আপনি মাঠে। ‘ঝাঁকড়া চুলের দীর্ঘদেহী ছেলেটি’ বলে যাকে বর্ণনা করা হচ্ছিলো, তার নাম নান্নু। তখন আপনি মাঝমাঠের খেলোয়াড়। হাঁটুতে আঘাতজনিত কারণে পরবর্তী বছরগুলিতে স্টপার হিসেবে খেলেছেন। মাঠে সবচেয়ে দ্রতগতির খেলোয়াড় আপনি ছিলেন না, তা আপনি নিজেও স্বীকার করবেন। আপনি খেলতেন নিজস্ব দক্ষতা, ফুটবলবোধ এবং বুদ্ধি ও সুবিবেচনা মেশানো এক অসাধারণ খেলা। দৃষ্টিনন্দন ছিলো আপনার পাসিং ও নিখুঁত হেডওয়ার্ক। হেড করে বলটি গোলমুখ থেকে সরিয়ে দেওয়াই একমাত্র কাজ নয়, বরং বলটিকে নিজ দলের খেলোয়াড়ের নাগালে পৌঁছে দিতে হবে, তা আপনার মতো করে আর কাউকে করতে ঢাকার মাঠ কখনো দেখেনি।

সবচেয়ে দর্শনীয় ছিলো আপনার স্লাইড ট্যাকল, স্টপারের সর্বশেষ অস্ত্র। খানিকটা জুয়ার মতো। রক্ষণভাগের শেষ খুঁটি স্টপার, যার পরাস্ত বা ব্যর্থ হওয়ার অর্থ বিপক্ষের আক্রমণের সামনে গোলরক্ষক সম্পূর্ণ একা ও অরক্ষতি। অথচ জুয়াটি খেলতেন আপনি খুব হিসেব করে, পেশাদার জুয়াড়ির দক্ষতায়। অধিকাংশ সময়ে আপনি জিতে এসেছেন অসাধারণ সময়জ্ঞানের কারণে। এই অস্ত্রটি আপনি ব্যবহার করতে জানতেন নিখুঁতভাবে। আপনাকে অনায়াসে বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও স্টাইলিশ স্টপার বলতে আমাদের একটুও ইতস্তত করতে হবে না।

এমনকি প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিলেন আপনি। ৮২-তে খেলা থেকে অবসর নেওয়ার আগে আপনার শেষ খেলাটি গ্যালারিতে বসে দেখেছিলাম, মনে আছে খেলার শেষে সতীর্থ ও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে আবেগময় বিদায় জ্ঞাপনের দৃশ্যটি। সারা স্টেডিয়ামের দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় অভিনন্দিত করেছিলো ঢাকার ফুটবলের রাজসিক খেলোয়াড়টিকে।

আজ আপনাকে লিখছি এই বিদায়ের প্রসঙ্গ নিয়েই। ডাক্তার জবাব দিয়েছে, আর কিছু করণীয় নেই – এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো কথা আর হয় না। যার প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে তার জন্যে তো বটেই, তার আশেপাশের মানুষ, প্রিয়জন ও স্বজন-বন্ধুদের জন্যেও এক ভয়াবহ অসহায়তার অনুভব। আপনার জন্যে অচেনা, কোনোদিন না-দেখা অসংখ্য মানুষও কাতর হবে, অশ্রু বিসর্জন দেবে। আপনি তার কিছুই জানবেন না। জেনেই বা কী এসে যাবে!

১৯৯৮ সালে একদিন পত্রিকায় পড়ে চমকে উঠলাম, কর্কটরোগে আক্রান্ত আপনি। এমনই এক রোগ যার নামই অস্তিত্বের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তবু চিকিৎসায় সেরে উঠলেন আপনি। কিছুকাল পরে আবার ফিরে এলো রোগ। এইভাবে ক্যানসারের সঙ্গে এক ধরনের লড়াই চলছিলো আপনার প্রায় দশ বছর ধরে। এই লড়াইয়ের মাশুল এখন গুনছে আপনার শরীর। কিডনি অকেজো হয়েছে, ডায়ালিসিস চলছে, তার সঙ্গে আরো আনুষঙ্গিক জটিলতা। স্টপার আজ ক্লান্ত, তার স্লাইড ট্যাকল হয়তো এবার ব্যর্থ হতে চললো। আজ একটু আগে জানলাম, সম্প্রতি আপনার ছোটোখাটো স্ট্রোকও হয়ে গেছে বার চারেক। ডায়ালিসিস চলছে ক্রমাগত।

এইসব সময়ে বোঝা যায় আমাদের মনুষ্যজীবনের নশ্বরতা ও সীমাবদ্ধতা। মতি নন্দীর ‘স্টপার’ উপন্যাসের পরাক্রান্ত স্টপার মাঠে অপরাজেয় হলেও বাস্তব জীবনের রূঢ় আক্রমণের সামনে সে প্রতিরোধহীন। মাঠে প্রতিপক্ষের দুরন্ত স্ট্রাইকারকে রুখে দেওয়ার কৌশল আপনার জানা ছিলো, কিন্তু এই যে চলে যাওয়ার কথা উঠছে সেখানে আপনার – বস্তুত সব মানুষেরই – কিছুই করণীয় নেই। অনিবার্য জেনেও এর জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না।

এদিকে মঞ্জু ভাই কী করেন? তিনি নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা ৯২ থেকে। গত বছর তাঁর ডালাস শহরে চলে আসার কথা, বাড়ি কিনে স্ত্রী-পুত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন, নিজে থেকে গেছেন নিউ ইয়র্কে। বিষণ্ণ মুখে বললেন, কী করে আসি? কখন নান্নুর কী খবর আসে, ওখান থেকে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে যেতে পারবো। কখন যেতে হয়, কে জানে!

৭২-এ শোনা আকাশবাণীর ধারাভাষ্যকারের বাক্যটি মনে আসে – মাঝমাঠে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটি কাউকে দাঁড়াতেই দিচ্ছে না। মহামহিম সেই অন্তিম হয়তো বাস্তব হয়ে মাঝমাঠের কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছে, সেখানে যে সে কাউকে কখনো দাঁড়াতে দেয়নি। দেবে না।

--------------------------------------------
জানুয়ারি ২৪, ২০০৮

Monday, January 14, 2008

‘ভাঙনের শব্দ শুনি’



এই রচনার শিরোনাম সেলিম আল দীনের লেখা একটি টিভি নাটক থেকে ধার করা। আশির দশকের গোড়ার দিকে বিটিভিতে অসম্ভব জনপ্রিয়তা পাওয়া একটি মিনি সিরিয়াল। যতোদূর মনে পড়ে, এই টিভি পর্দায় হুমায়ূন ফরীদির সর্বপ্রথম খল চরিত্রে অভিনয়, অতি তরুণ বয়সে সে করেছিলো মধ্যবয়সী গ্রাম্য মাতবর সেরাজ তালুকদারের চরিত্রটি। ‘আমি তো জমি কিনি না, পানি কিনি, পানি’ সংলাপটি তখন মানুষের মুখে মুখে। নাটকের প্রযোজক ছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

সেলিম আল দীন চলে গেলেন, কোনো ঘোষণা না দিয়ে। ৫৮ বছর কি চলে যাওয়ার বয়স? আমাদের মতো কতো হেঁজিপেঁজি মানুষ পৃথিবীতে দীর্ঘকাল বেঁচে আছি, থাকবো। সময় না হতেই চলে যাবেন সেলিম আল দীনের মতো প্রতিভাবানরা। ঠিক সুবিচার মনে হয় না।

আজ আমার মন ভালো নেই। সকালে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও গেলাম না, ইচ্ছে করলো না। সাতসকালে ঢাকা থেকে ফোন এলো পীযূষ ও ফরীদির। তার আগেই বিডিনিউজ আমাকে খবর দিয়ে দিয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় আসাদকে ফোন করি, কানাডায় দিনু বিল্লাহকে, ন্যাশভিলে রেজাকে। কারো সঙ্গেই বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব হয় না। নিকটজনের প্রয়াণে যেরকম হয়।

না, সেলিম ভাই আমার রক্তসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন না, ছিলেন আত্মার আত্মীয়। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ও খুব গভীরে যায়নি। অথচ আশ্চর্য এক বাঁধনে তিনি বেঁধে ফেলেছিলেন আমাকে এবং আমার মতো আরো অনেককে তাঁর রচনা, প্রতিভা এবং অসামান্য কর্মদক্ষতায়। আমাদের মুগ্ধ ও মোহিত করে রাখলেন অনেকদিন ধরে। এবং অতঃপর প্রস্থান করলেন।

১৯৭৩-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কেনা কয়েকটি বইয়ের মধ্যে ছিলো টিএসসি-র বুকস্টোর থেকে কেনা একটি পেপারব্যাক ‘সর্প বিষয়ক গল্প ও অন্যান্য’। রচয়িতা সেলিম আল দীন। তখন তিনি উঠতি নাট্যকার, স্বাধীনতার পরে ঢাকার নতুন ধারার নাটকের প্রধান পুরুষদের একজন। ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ ততোদিনে অভিনীত হয়ে গেছে, গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটছে। ঢাকা থিয়েটার গঠিত হলো, সূচনাপর্ব থেকে অন্তিম দিন পর্যন্ত সেখানে জড়িত ছিলেন তিনি।

সেলিম আল দীনের রচনা এবং নাসিরউদ্দিন ইউসুফের নির্দেশনার যে যুগলবন্দী তৈরি হলো ৭৩-এ, তা বাংলাদেশের নাটককে দিয়েছে অপরিমেয়। সেলিম আল দীনের রচনায় মঞ্চে এলো বাংলাদেশের প্রথম মিউজিক্যাল স্যাটায়ার ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’, ‘বনপ্রাংশুল’, ‘চাকা’, ‘সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘নিমজ্জন’। ৭৭-এ বাংলাদেশের প্রথম পথনাটক ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’। টিভিতে ‘রক্তের আঙুরলতা’, ‘গ্রন্থিকগণ কহে’। এই তালিকা নিতান্তই অসম্পূর্ণ, যা তাঁর রচনার ব্যাপ্তি ধারণ করে না।

সেলিম আল দীনের নাট্যরচনার শুরু ছিলো পাশ্চাত্য ধাঁচে, কিছুটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ধরনের। অবিলম্বে তিনি নিজের পথ খুঁজে পেলেন দেশীয় ঐতিহ্য ও লোকজ ধারা এবং প্রাচ্য দর্শনে। তাঁর সব উল্লেখযোগ্য কাজ এই ধারার।

সাহিত্যরচনা তিনি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে, বেশিদিন থাকেননি সেখানে। রসিকতা করে বলতেন, আমি তো ব্যর্থ কবি, তাই গদ্যরচনা করি।

তবে তাঁর কিছু নাটকে আশ্চর্য কাব্যময় কিছু পংক্তি আমরা পেয়েছি। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করি ‘শকুন্তলা’ নাটকের একটি সংলাপ : আমার প্রার্থনা চৈত্রের শিমুল তুলো – লক্ষ্যহীন কেবলই উড়ে যায়, স্পর্শ করে না!

ঠিক তার বিপরীতে মানুষের প্রতিদিনের মুখের ভাষার একটি নমুনা ‘কিত্তনখোলা’ থেকে : ডালিমনের গায়ের ঘাম, চুকা চুকা গন্ধ।

অনেক বড়ো ক্ষমতাবান লেখক ছাড়া এই বৈপরীত্য ধারণ করা সম্ভব নয়। পড়াশোনায় ছিলেন অক্লান্ত, আগ্রহ ছিলো তাঁর বিচিত্র বিষয়ে। সেলিম আল দীন কীরকম বিশুদ্ধতাপিয়াসী পরিশ্রমী লেখক ছিলেন তার পরিচয় দিতে এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে শকুন্তলা নাটকটি তিনি সতেরো-আঠারোবার লিখেছিলেন। লিখতে বসলে আহার-নিদ্রা ভুলে যেতেন, লিখতেন ঘোরগ্রস্তের মতো। এমন ঘটনাও আছে, একটা লেখা রাত তিনটায় শেষ করে ফরীদিকে ডেকে আনছেন পড়ে শোনাবেন বলে।

কবি রফিক আজাদ আজ পুত্রহারা হলেন। সেলিম আল দীনকে তিনি বলতেন বেটা, সেলিম ভাই তাঁকে বাপ ডাকতেন। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের বন্ধুত্বে আজ ছেদ পড়লো।

সেলিম ভাইকে আমি প্রথম দেখি ৭৪ বা ৭৫-এ টিএসসির দোতলায় ঢাকা থিয়েটারের রিহার্সালে। একদিকে নাটকের মহড়া চলছে, আর তিনি মেঝেতে বসে গভীর মনোযোগে কাগজপত্র ওল্টাচ্ছেন, পাণ্ডুলিপি সংশোধন করছেন। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। এরপর মগবাজারে আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ঢাকা থিয়েটারের মহড়া হতো, সেখানেও প্রায় একই ভঙ্গিতে তাঁকে দেখতাম। বাচ্চু ভাইয়ের পুরানা পল্টনের বাসায়ও হুবহু এক ভঙ্গিতে তাঁকে দেখেছি। সেলিম ভাইকে ভাবলে মেঝেতে বসা তাঁর এই ছবিটিই আমার মনে আসে।

একটু আগে ঢাকা থেকে আমার আরেক বন্ধু আলমগীর ফোন করে বলে, আজ আমার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে দোস্ত। সেলিম ভাই আমাদের কী ভালোবাসতেন, সেই মানুষ আজ নেই।

ঢাকায় তখন রাত একটা, বান্ধবহীন আলমগীর একা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে সেলিম ভাইয়ের জন্যে মন খারাপ করে। সেলিম ভাই আমাদের চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড়ো ছিলেন। হয়তো তাঁর এই প্রস্থান (নাটকীয় বলতে লোভ হয়, প্রস্থান শব্দটি নাটকে অপরিহার্য শব্দ) আমাদের ক্রমাসন্ন পরিণতির কথা ভাবায়। মনে হয় ভাঙনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর আমাদের কালের নায়করা কেউ কেউ প্রস্থান করেছেন, অনেকে প্রস্থানোদ্যত। মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা রাইসুল ইসলাম আসাদ প্রায় পঙ্গু অবস্থা কাটিয়ে নতুন করে হাঁটা শিখছে, ফরীদি হাঁপানি-নিউমোনিয়ার প্রকোপ সামলে হাসপাতাল থেকে সদ্য ফিরেছে, ফুটবলার নান্নুকে ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে। আমরা সবাই আসছি কিছু আগে বা পরে।

বিদায়, সেলিম ভাই। একজন অনুরাগীর অভিবাদন নিন।

Sunday, December 30, 2007

ছবিতা (শহীদ কাদরীর কবিতা + কাজী হাসান হাবিবের ছবির যুগলবন্দী)

বৃষ্টি, বৃষ্টি
শহীদ কাদরী

সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর-ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে
যারা তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটলো, চৌদিকে
ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত যেন বা মড়কে
শহর উজাড় হবে, – বলে গেল কেউ – শহরের
পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে খুব ঠাণ্ডা এক ভয়াল গলায়

এবং হঠাৎ
সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে
বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম!
বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি : শ্রুতিকে বধির ক’রে
গর্জে ওঠে যেন অবিরল করাত-কলের চাকা,
লক্ষ লেদ-মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আবর্তন!

নামলো সন্ধ্যার সঙ্গে অপ্রসন্ন বিপন্ন বিদ্যুৎ
মেঘ, জল, হাওয়া, –
হাওয়া, ময়ুরের মতো তার বর্ণালী চিৎকার,
কী বিপদগ্রস্ত ঘর-দোর,
ডানা মেলে দিতে চায় জানালা-কপাট
নড়ে ওঠে টিরোনসিরসের মতন যেন প্রাচীন এ-বাড়ি!
জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের জানু
আর চকচকে ঝলমলে বেসামাল এভিনিউ

এই সাঁঝে, প্রলয় হাওয়ার এই সাঁঝে
(হাওয়া যেন ইস্রাফিলের ওঁ)
বৃষ্টি পড়ে মোটরের বনেটে টেরচা,
ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নীচু
ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে
দ্যাখে, – জল
অবিরল
জল, জল, জল
তীব্র, হিংস্র
খল,
আর ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় শোনে
ক্রন্দন, ক্রন্দন
নিজস্ব হৃৎপিণ্ডে আর অদ্ভুত উড়োনচণ্ডী এই
বর্ষার ঊষর বন্দনায়

রাজত্ব, রাজত্ব শুধু আজ রাতে, রাজপথে-পথে
বাউণ্ডুলে আর লক্ষ্মীছাড়াদের, উন্মূল, উদ্বাস্তু
বালকের, আজীবন ভিক্ষুকের, চোর আর অর্ধ-উন্মাদের
বৃষ্টিতে রাজত্ব আজ। রাজস্ব আদায় করে যারা,
চিরকাল গুণে নিয়ে যায়, তারা সব অসহায়
পালিয়েছে ভয়ে।

বন্দনা ধরেছে, – গান গাইছে সহর্ষে
উৎফুল্ল আৎধার প্রেক্ষাগৃহ আর দেয়ালের মাতাল প্ল্যাকার্ড,
বাৎকা-চোরা টেলিফোন-পোল, দোল খাচ্ছে ওই উৎচু
শিখরে আসীন, উড়ে-আসা বুড়োসুড়ো পুরোন সাইনবোর্ড
তাল দিচ্ছে শহরের বেশুমার খড়খড়ি
কেননা সিপাই, সান্ত্রী আর রাজস্ব আদায়কারী ছিল যারা,
পালিয়েছে ভয়ে।

পালিয়েছে, মহাজ্ঞানী, মহাজন, মোসাহেবসহ
অন্তর্হিত,
বৃষ্টির বিপুল জলে ভ্রমণ-পথের চিহ্ন
ধুয়ে গেছে, মুছে গেছে
কেবল করুণ ক’টা
বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে
বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো
নর্দমার ফোয়ারার দিকে, –

ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন
ভাঙা কাচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন
মসৃণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি
লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপশন, শাদা বাক্সে ওষুধের
সৌখীন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার
ভবিতব্যহীন নানাস্মৃতি আর রঙবেরঙের দিনগুলি

এইক্ষণে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে
নগ্নপায়ে ছেৎড়া পাৎলুনে একাকী
হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে
ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকার মতো একমাত্র আমি,
আমার নিঃসঙ্গে তথা বিপর্যস্ত রক্তেমাংসে
নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে গলা আত্মা জ্বলে
কিন্তু সাড়া নেই জনপ্রাণীর অথচ
জলোচ্ছ্বাসে নিঃশ্বাসের স্বর, বাতাসে চিৎকার,
কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে
জলের আহ্লাদে আমি একা ভেসে যাবো?

Monday, November 12, 2007

‌‌‌প্রলয়ের একরাত্রি : ‘ঘুমো বাছা ঘুমো রে / সাগর দিলো চুমো রে...’




১৯৭০ সাল। আর মাসখানেক পর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন। ৪৭-এ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ২৩ বছরে এই দ্বিতীয়বার। আগের বছর প্রবল গণঅভ্যুত্থানে লৌহমানব বলে কথিত আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের জগদ্দল ভেসে গেছে খড়কুটোর মতো। এই বিজয়ের জন্যে মূল্য অবশ্য কম দিতে হয়নি পূর্ব বাংলাকে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নির্দয় প্রহার, টিয়ারগ্যাস, গুলি সবই বিপুল পরিমাণে জুটেছিলো। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে এই নির্বাচন। স্পষ্ট মনে আছে, আসন্ন এই নির্বাচনটিকে অনেকে বাঙালির অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে নিয়েছিলেন। তাদের দূরদর্শিতা প্রমাণিত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তা অন্য প্রসঙ্গ।

এই নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং উপলক্ষ করে যখন সারা দেশ জেগে উঠেছে, তখন এসেছিলো এক মরণ ছোবল। এই ভূখণ্ডের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সমগ্র সমুদ্র-উপকূলে হারিকেন ও প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে মাত্র এক রাতে কয়েক লক্ষ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু কিছুই রক্ষা পায়নি। তারিখ ১২ নভেম্বর। ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশিত হতেও সময় লেগেছিলো। যখন জানা গেলো যে মৃত মানুষের সংখ্যা বারো লক্ষ (মতান্তরে দশ লক্ষ), তখন পৃথিবী থমকে যাওয়ার অনুভূতি হওয়াই স্বাভাবিক।

প্রকৃতির আঘাত যখন আচমকা আসে তখন মানুষ সত্যিই অসহায়। কিছু সতর্কতা হয়তো সম্ভব, তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছু কমে। কিন্তু ১২ নভেম্বরের ওই দুর্যোগের আভাস খুব সামান্যই জানা গিয়েছিলো। পরে প্রকাশিত হলো এই অবিশ্বাস্য তথ্য যে এই ঝড় সম্পর্কে তথ্য থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার তা আমলে নেয়নি, যথাসময়ে সতর্কতাও আসেনি। ঝড়ের পূর্বাভাস ছিলো, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুমাত্র আভাসও ছিলো না। ফলে এই অঞ্চলের মানুষ যারা এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেচে থাকে তারা এই পূর্বাভাস নিয়ে আলাদা করে মাথা ঘামায়নি। অনিবার্য ফল হিসেবে কয়েক লক্ষ মানুষ নেই হয়ে গেলো একরাত্রির ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে। এই সেদিনের হারিকেন কাটরিনার তুলনায় সে দুর্যোগ কিছুমাত্র খাটো ছিলো না।

এই বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরেও পাকিস্তানী শাসকদের ত‌‌‌‌ৎপরতা খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি, তা ত্রাণে, না সহানুভূতিতে। আরো একবার বোঝা গিয়েছিলো পূর্ব বাংলা ঠিক পাকিস্তান নয়।

আমাদের বাড়িতে তখন দৈনিক পূর্বদেশ রাখা হতো। এই কাগজটি এই দুর্যোগের অসাধারণ কাভারেজ করেছিলো মনে আছে। বিশাল ব্যানার হেডিং করেছিলো : ‘কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো’ এবং সেদিন কাগজের প্রথম পাতার মাস্টহেড নামিয়ে দেয় একেবারে তলায়। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এই ঘটনা আমার জানামতে ওই একবারই ঘটেছিলো।

তখন কেন্দ্রীয় সরকারে ছয়জন বাঙালি মন্ত্রী ছিলেন। একদিন প্রথম পাতায় পাশাপাশি তাঁদের ছোটো ছবি ছাপা হলো, তার নিচে জনসভায় বক্তৃতারত ভাসানীর বিশাল ছবি, তাঁর উদ্যত তর্জনী ওই ছবিগুলোকে নির্দেশ করছে। সঙ্গে হেডিং : ‘ওরা কেউ আসেনি’।

মনে পড়ে গেলো এইসব কথা। আসলে ভোলা তো হয় না। এই কাগজগুলি আমাদের বাড়িতে এখনো সযত্নে রক্ষিত আছে। হাজার হাজার মাইলের ব্যবধানে না থাকলে এগুলি স্ক্যান করে তুলে দেওয়া যেতো। তা তো আর হওয়ার নয়, পরবাস যাপনের মাশুল।

পূর্বদেশ-এ দিনের পর দিন ওই দুর্যোগে নিহত মানুষের, গবাদি পশুর পড়ে থাকা লাশের ছবি ছাপা হয়েছে। একদা কোলাহলময়, এখন বিরান সব জনপদের ছবি দেখে মন ভারি হয়ে ওঠে। একদিন এরকম কিছু ছবির সঙ্গে রফিকুল হক লিখলেন একটি অবিস্মরণীয় ছড়া :

ছেলে ঘুমলো বুড়ো ঘুমলো ভোলাদ্বীপের চরে
জেগে থাকা মানুষগুলো মাতম শুধু করে
ঘুমো বাছা ঘুমো রে
সাগর দিলো চুমো রে
খিদে ফুরোলো জ্বালা জুড়লো কান্না কেন ছি
বাংলাদেশের মানুষ বুকে পাষাণ বেঁধেছি।

Saturday, October 27, 2007

শাচৌ ও আধো ঘুম আধো জাগরণের একরাত্রি



শাহাদত চৌধুরী আর নেই। খবরের শিরোনাম দেখে চমকে উঠি। কখনো কখনো সময়মতো দেশের সব খবর পাওয়া হয়ে ওঠে না। শাচৌ-এর প্রস্থানের খবরও জানলাম কিছু বিলম্বে। পরবাস যাপনের মাশুল।

আমাদের সময়ের প্রকৃত সাহসী সম্পাদকদের একজন শাহাদত চৌধুরী। ঘনিষ্ঠদের কাছে পরিচিত ছিলেন শাচৌ নামে, জানতাম। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় কখনো ঘটেনি। বিচিত্রা অফিসে দুয়েকবার গিয়েছি, সম্পাদকের কক্ষের বাইরে থেকে খোলা দরজা দিয়ে তাঁকে দেখেছি। ওই পর্যন্তই। অথচ শাহাদত চৌধুরী নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় ষাটের দশকের শেষভাগে ললনা পত্রিকার সুবাদে। তখন আমি স্কুলে উঁচু ক্লাসের ছাত্র।

মুক্তিযুদ্ধফেরত তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র ভার নিয়েছিলেন। কাগজটির মূল পরিকল্পক, উদ্যোক্তা ও প্রথম সম্পাদক ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। সরকারি পত্রিকা দৈনিক বাংলা-র সহযোগী সাপ্তাহিক (শুরুতে পাক্ষিক) হিসেবে বেরোয় বিচিত্রা। শাহাদত চৌধুরী দীর্ঘকাল ভারপ্রাপ্ত ও পরে পূর্ণ সম্পাদক ছিলেন। সেই ভারপ্রাপ্ত-র যুগেও সবাই জানতো বিচিত্রা শাহাদত চৌধুরীর পত্রিকা। সত্তরের মাঝামাঝি থেকে কাগজটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সাপ্তাহিক। বলতে গেলে একটা সময় ছিলো যখন বিচিত্রা বাংলাদেশের সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজ-প্রেক্ষিত, তারুণ্যের প্রবণতা, এমনকি ফ্যাশন - এই সবকিছুর মানদণ্ড নির্ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। মোটকথা, বিচিত্রা-র একেকটি সংখ্যা ছিলো সমসাময়িক বাংলাদেশের ছবি।

কাগজটি সরকারি থেকে ব্যক্তি মালিকানায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত অবস্থা এরকমই ছিলো। বাংলাদেশে এ-ও ছিলো এক ব্যতিক্রম। হয়তো ব্যতিক্রমও নয় আমাদের শাসকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতার কথা ভাবলে - লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে যে কোনো ছলে ব্যক্তির মালিকানায় চালান করে দেওয়ার ব্যাপারে তারা বরাবর দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। সরকারি থাকার কালে যে বিচিত্রা ছিলো খ্যাতির শীর্ষে, মালিকানা বদলের পর সেই গৌরবের ধারেকাছেও আর থাকতে পারেনি পত্রিকাটি। একজন যোগ্য সম্পাদক যে কাগজের জন্যে কতোটা জরুরি, এই ইতিহাস তো সেই কথাই বলে।

একটি পত্রিকা মূলত তার সম্পাদকের চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের সম্প্রসারণ। সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর সবচেয়ে বড়ো গুণ ছিলো তাঁর সাহস, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা। সরকারি কাগজে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, সরকারের কিছু গুণগান করতেই হয় বাধ্যতামূলকভাবে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিচিত্রা সরকারি নীতি ও কার্যকলাপের সমালোচনার সৎসাহস দেখিয়েছে, সরকারি নীতির সঙ্গে খুব সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন প্রতিবেদন অসংখ্য ছেপেছে। সম্পাদকের বিবেচনাপ্রসূত সাহসিকতা ব্যতিরেকে এটি কিছুতেই সম্ভব হতো না। পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে এই সাহস বাংলাদেশের খুব বেশি কাগজ তখন দেখাতে পারেনি। সময়োচিত এই সৎসাহসই বিচিত্রা-কে পাঠকদের কাছে অতোখানি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলো। সরকারি আওতার বাইরে এসে পরবর্তীকালে সাপ্তাহিক ২০০০-এর সম্পাদক হিসেবেও শাহাদত চৌধুরী সেই সাহস ও যোগ্য সম্পাদনার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিলেন। অথচ বরাবর ছিলেন নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ, আত্মনিমগ্ন মানুষ।

সম্পাদক হিসেবে নিজের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টি তিনি কখনোই বিস্মৃত হননি। যে কল্যাণমুখী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র নির্মাণের জন্যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তার আদর্শগুলি ধরে রেখেছিলেন তাঁর কাগজে। যাবতীয় শুভবোধের পক্ষে এবং পশ্চাৎমুখী চিন্তার বিপক্ষে ছিলেন বরাবর। বাংলাদেশে মোল্লাতন্ত্রের উত্থানের বিষয়ে প্রাথমিক সতর্কবাণীও তাঁর কাগজ থেকেই এসেছিলো।




শাচৌ-এর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি, রাতভর আধো ঘুম আধো জাগরণের ভেতরে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেছি। নামে চেনা মানুষটির জন্যে তা ঘটেছিলো বললে বাড়াবাড়ি হবে। অন্য কোনো কারণ হয়তো ছিলো। কর্মোপলক্ষে অচেনা শহরের হোটেলকক্ষে রাত্রিযাপনও তার একটি কারণ হতে পারে। অথচ রাতভর ওই তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যে টের পাই, আমি সর্বক্ষণ শাচৌকেই ভাবছি, মাথার ভেতরে তাঁর অবিচুয়ারি লেখা হচ্ছে। দু'একবার তন্দ্রা ছুটে গেলে অন্যকিছু ভাবার চেষ্টা করি, সমর্থ হই না। শাচৌ নামের মানুষটিকে দূর থেকে চিনি, তাঁর সম্পাদিত কাগজে আমার দু'একটি রচনা ছাপা হয়েছে - এই তো। তাঁর মৃত্যু আমার মনোকষ্টের কারণ হতে পারে, নির্ঘুম রাত্রির কারণ হয়ে ওঠাটা কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক যে কখন কী কারণে বিচলিত হয়, তার খবর আমরা কতোটুকু জানতে পারি!

সকালে বিছানা ছাড়তে গিয়ে টের পাই, সারারাত শাচৌ-এর জন্যে মনে মনে যে শোকগাথা লিখেছি, সেখানে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টিই সবচেয়ে বড়ো ছিলো। সম্পাদক হিসেবে শাহাদত চৌধুরী সফল ছিলেন, অনেক লেখককে লেখক হয়ে উঠতে তিনি সহায়তা দিয়েছেন, তাঁর হাত ধরে অনেক সাংবাদিকই সাংবাদিক হয়ে উঠেছেন, বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তি ও মুক্তচিন্তাকে তিনি বেগবান রাখতে পেরেছেন। এসবই তাঁর কীর্তি ও সাফল্য। অথচ আমার সেই আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টিই সবচেয়ে বড়ো হয়ে প্রতিভাত হয়। জানি, আমার অবচেতন ভুল কিছু করেনি। কাগজের সম্পাদক চলে গেলে আরেকজন যোগ্য সম্পাদক পাওয়া হয়তো সম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা চলে গেলে আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা পাওয়া যায় না - সে জায়গাটি শূন্যই পড়ে থাকে।

------------------
ডিসেম্বর ২০০৫
------------------

হাবিব, বন্ধু আমার






আপনার আঁকা একটি ছবির নাম দিয়েছিলেন 'উইদিন, উইদাউট'। আপনার প্রথম একক প্রদর্শনীর প্রস্তুতির সময় ছবিটির একটি উপযুক্ত বাংলা নামের জন্যে দু'জনে অনেক সময় ব্যয় করেছিলাম মনে আছে। তখন একমাত্র বিবেচনা ছিলো নামটিতে যেন ইংরেজির মতো কাব্যিক দ্যোতনা অক্ষুণ্ণ থাকে। এখন 'উইদিন, উইদাউট'-এর সঠিক মানে জানি - উইদাউট অবস্থার মধ্যে পতিত না হলে উইদিন-কে ভালো জানা হয় না। আপনি চলে যাওয়ার পর পনেরো বছর ধরে জানছি। শেষ সময়ে আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, কথাও না। বিদায় দেওয়া-নেওয়া হয়নি। ভাবি, কী করে পারলেন! আমি পরবাসী হওয়ার পর মাত্র একবার ফোনে কথা হয়েছিলো। ফোন তুলে বললেন, এরকম তো কথা ছিলো না! সেই বাক্যটিই এখন আপনাকে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ফোনে কী আর আপনাকে পাওয়া যাবে? তাহলে কাকে আর বলি!

আপনাকে নিয়ে লেখা আমার জন্যে সহজ নয়, আপনি বুঝবেন। আপনি কি বুঝেছিলেন, আপনার শেষ দিনগুলোতে আমি ঢাকায় উপস্থিত ছিলাম না? কেউ সেই সময়ে আপনাকে জানিয়েছিলো, আমি ঢাকায়। সিরাজকে, সারোয়ারকে বলেছিলেন যাচাই করতে। আপনার চলে যাওয়া তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, অথচ আমি ঢাকায় উপস্থিত থেকেও আপনার কাছে যাইনি - জানি না কার মাথায় এই নিষ্ঠুর রসিকতা করার বুদ্ধি এসেছিলো। আমি যে তখন সত্যিই ঢাকায় নেই, আপনি বিশ্বাস করেছিলেন কি না কোনোদিন জানা হবে না। আপনার শেষ দিনগুলোর আবাস মহানগর ক্লিনিকে ফোন করে হীরু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমাদের হীরু ভাই, ডাক্তার, কোনো ভরসা দেননি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি জানালেন, সে অবস্থাও আর নেই!

প্রায় অনন্তকালের দূরত্বে বসে তখন নিজেকে কীরকম অসহায়, নিষ্ফল এবং করুণ মনে হয়েছিলো, কোনোদিন লিখতে পারিনি। আপনার শরীরে ক্যানসার পাওয়া গেলো অক্টোবরে, ৮৮-র বন্যায় সারাদেশ তখন ডুবে আছে। আপনাকে বম্বেতে পাঠানো হয়েছিলো, ফিরে এলেন। এতো কিছু ঘটে গেলো দু'মাস সময় ধরে, তার কিছুই আমার জানা হয়নি। ডিসেম্বরের আঠারোতে ঢাকায় ছোটো বোনের কাছে ফোন করে জানলাম। ফোন করি তখন মহানগরে। আঠারোর পরে তেইশে আবার ফোন করে জেনেছি কোনো উন্নতি নেই, সময় ফুরিয়ে আসছে। হীরু ভাইকে বলেছি, এখান থেকে আমার কিছু করার থাকলে জানান।

অর্থহীন কথা, খুবই বোকা বোকা। যা নির্ধারিত হয়ে আছে, আমি তা বদলানোর কে! ফোন রেখে দিলে এক ধরনের আতঙ্ক আমাকে পেয়ে বসে। আমার স্ত্রীকে বলি, হাবিব এই পঁচিশ তারিখেই যাবে, আমি জানি। ডিসেম্বরের পঁচিশে ওর জন্মদিন। ওকে যদি কিছুমাত্র চিনে থাকি, আমি জানি ওই দিনটিই সে ঠিক করে রেখেছে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার জন্যে!

মৃতু্যশীতল সেই ডিসেম্বরের চবি্বশ গেলো, পঁচিশ-ছাবি্বশ-সাতাশ গেলো। ঢাকায় কাউকে ফোন করার সাহস হয় না। আমি তো জেনে গেছি, কী শুনবো! শুনতে চাইনি। অথবা চেয়েছি যতোটা দেরিতে জানা যায়। নিজের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও পরাস্ত হয়ে আবার ঢাকায় ফোন করি ৮৯-এর জানুয়ারির প্রথম দিনে। ধারণাটিকে যাচাই করে নেওয়া, আর কিছু নয়। আপনি গেলেন সেই পঁচিশেই, আপনার জন্মদিনে।

এখন এই ডিসেম্বরে আপনার বয়স হতে পারতো পঞ্চান্ন। অথচ আপনি আটকে থাকলেন চল্লিশেই। রাসুল গামজাতভ নামের সোভিয়েত কবির একটি কবিতা সম্ভবত আপনিই পড়িয়েছিলেন। কবি স্মরণ করছেন, বাল্যকালে তিনি তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ ভাইয়ের সমান কিছুতেই হতে পারছেন না বলে দুঃখিত ও হতাশ। ভাই যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরে না, কোনোদিন ফিরবে না। বিষণ্ণ কবি এখন সেই ভাইয়ের চেয়েও বয়সে বড়ো, অথচ এই বোধ তাঁকে কোনো পরিতৃপ্তি দেয় না! হাবিব, আপনি বয়সে বড়ো ছিলেন। তখন। এখন আর নয়। আমি আপনার চেয়ে বয়সে বড়ো হয়ে উঠবো, কোনোদিন ভেবেছি! পঞ্চাশের এপারে-ওপারে থাকা আমাদের মনে হতেই পারে, এই বিষণ্ণ বয়স আপনাকে চিনতে হলো না। আপনার তারুণ্যের ছবিটিই চিরকালের হয়ে থাক বরং।

পনেরো বছরে আপনাকে নিয়ে পনেরোটা অক্ষরও লেখা হয়নি আমার। ছেঁড়া টুকরো টুকরো কোনো কথা, কোনো ঘটনা মনে এলে সামলাতে শিখে নিয়েছি এতোদিনে। কিন্তু লিখতে বসলে যে আস্ত ছবিটা এসে সামনে হাজির হবে, তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমি কোথায় পাবো?





সেই সময় আমরা কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন ছিলাম। বিশ শতক ফুরিয়ে যেতে তখনো বাইশ-তেইশ বছর বাকি। আমরা বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলের ২১৭ নম্বরে নিয়মিত সান্ধ্য আড্ডায় হাজিরা দিতে আসা কয়েকজন। জহুরুল হক হলের ৩৬৪ থেকে আসে ফিরোজ সারোয়ার। নারিন্দার ২৪/১ বেগমগঞ্জ লেন থেকে সিরাজুল ইসলাম। গেণ্ডারিয়ার ৪ রজনী চৌধুরী রোডের ইমদাদুল হক মিলন। সূর্যসেনে ২১৭-র বাসিন্দা আমি। অনিয়মিত আসে বুলবুল চৌধুরী, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়। সুকান্ত তখন পাশ করা ডাক্তার, বিবাহিত এবং গৃহী। তবু তার সংসারবুদ্ধি খুব আঁটোসাঁটো ছিলো বলে মনে হয় না। আর পাশ দিলেই চাকরি করতে হবে এমন কথা কোথাও লেখা নেই বলে সিরাজ তড়িৎ প্রকৌশলের বিদ্যা নিয়ে ঠিকাদারী করে। মিলনও তখন ফুলটাইম ঠিকাদার, জগন্নাথ কলেজে পার্টটাইম ছাত্র। বুলবুল একটি পত্রিকায় কাজ করে। ফুলটাইম ছাত্রের ঝাণ্ডাওয়ালা শুধু সারোয়ার আর আমি - আসলে কাজীর গরু, খাতায় থাকলেও গোয়ালে নেই। সেই দুরন্ত অস্থির সময়ে বাংলাদেশ চলেছে এক বিষম অনিশ্চিত ঘোরের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, ক্যু, সামরিক শাসনের জগদ্দল, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মহোৎসব। ত্বরিত অর্থোপার্জন ও ভাগ্যগঠনের সুযোগ নাগালের খুব দূরে নয়। সেদিকে মনোযোগ আমাদের ছিলো না। সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেরাই ছত্রখান হয়ে আছে, আমাদের সামান্য সামর্থ্য এসবের বিপরীতে দাঁড়ায় কী করে! যৌবন পরাজয় স্বীকার করতে জানে না, পাশ কাটাতে চায় বড়োজোর। আমরা পলায়ন করতে চেয়েছি, শিল্প-সাহিত্যের স্বেচ্ছাচারিতার ভেতরে আশ্রয় খুঁজেছি।

এই কাণ্ডজ্ঞানহীনদের দলে হাবিবের শামিল হওয়ার আপাত কোনো কারণ ছিলে না। তার ছিলো স্ত্রী-পুত্রসহ সংসার, একটি স্থির রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কিছু অপ্রত্যক্ষ (সেই সময়ে) তৎপরতা, তথ্য দফতরে সরকারি চাকরির পাশাপাশি দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক রোববারে খণ্ডকালীন কাজ। বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকায় কাইয়ুম চৌধুরী-পরবর্তীকালে হাবিব ছিলো সফলতম, সে ব্যস্ততাও কম নয়। এতোকিছুর পরেও ছবি আঁকার সময় তার আলাদা করা ছিলো। কলাবাগানের টিনের চালওয়ালা দুই কামরার বাসায় শয়নকক্ষের সঙ্গে লাগোয়া উত্তরের বারান্দায় খাবার টেবিল। অন্যটি বসার ঘর এবং সেখানেই হাবিবের কাজের জায়গা। চারদিকে বইপত্র, সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণ ছবি, রং-তুলি, সাদা ক্যানভাস। সংসারের সকল কর্মের শেষে আঁকতে বসতো সে গভীর রাতে। দু'তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগ ছিলো না। উজ্জ্বল রোদ তার রাতজাগা চোখ সহ্য করতে পারতো না, ভুরু কুঁচকে আলো সামাল দিতো সে।

এই হাবিব কী করে যে ২১৭-র (এই নামটিই আমাদের মধ্যে চালু ছিলো) আড্ডায় নিয়মিত আসতো জানি না। তবে রাত ন'টার পরে ওকে ধরে রাখা যেতো না, তখন তাকে বাড়ি ফিরতেই হবে। আন্দোলন জারি রাখা বলে রাজনীতিতে একটা কথা চালু ছিলো তখন। হাবিব চলে গেলে আমরা বাকি চারজন আড্ডা জারি রাখতাম। সারোয়ার ততোদিনে বলতে গেলে ২১৭-র দ্বিতীয় স্থায়ী বাসিন্দা, কোনো কোনো রাতে সিরাজ-মিলনেরও পুরনো ঢাকায় আর ফিরতে ইচ্ছে করতো না।

একদিন এই আড্ডায় সিরাজ 'হরিণের দুধ' নামে একটি কিশোর উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা শোনায়। কথা বলতে বলতে হাবিব বলপয়েন্টে নিউজপ্রিন্টের ওপরে বইয়ের প্রচ্ছদের একটি স্কেচ করে ফেলে। সে উপন্যাস সিরাজের লেখা হয়নি। স্কেচটি থেকে যায় আমার কাছে। বহু বছর।

আরেক সন্ধ্যায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আমরা কে কোথায় কী করবো, এই প্রসঙ্গ জরুরি হয়ে ওঠে। হাবিব আমাদের প্রত্যেকের প্রৌঢ় বয়সের একটি করে স্কেচ করেছিলো। আমারটিতে দেখা যাচ্ছে, আলোয়ান গায়ে দেওয়া একটি ভগ্ন মুখে সুদৃশ্য গোঁফ, বিস্তৃত কপালে বিস্তর বলিরেখা। নিচে লেখা, ভবিষ্যতের মু.জু.। অন্যরা তাদের ভবিষ্যতের ছবি রেখেছিলো কি না জানি না, আমারটি ছিলো। হাবিবের অন্তর্ধানের (মৃত্যু শব্দটি খুব কঠিন, আর হাবিবের বেলায় তা আমার বিশ্বাসের বাইরে। এখনো। চোখে দেখিনি যে!) পরে ঢাকায় গিয়ে স্কেচ দুটি জ্যোৎস্না ভাবীর কাছে গচ্ছিত রেখে আসি। নিউজপ্রিন্টের তৈরি লেখার একটি খাতা ছিলো হাবিবের (কোনো পত্রিকার ডামি হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছিলো, অনুমান করি)। তার লেখা একটি অসমাপ্ত গল্প ছিলো সেই খাতায়। বলেছিলো, গল্পটা আর আমার লেখা হবে না। খাতাটা আপনার কাছেই থাক, আপনি লিখে ভরাবেন। এই খাতাটিও জ্যোৎস্না ভাবীর সংগ্রহে দিয়ে এসেছি। এগুলো তাঁর কাছে অমূল্য!




বসন্তকালের এক সন্ধ্যায় হাবিবের সঙ্গে শাহবাগ হয়ে রমনার দিকে হাঁটছি। সিদ্ধেশ্বরী বা মালিবাগ কোথাও যাওয়ার কথা। শর্টকাট করার জন্যে টেনিস কমপ্লেক্সের পাশ দিয়ে রমনা পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়ি, পুরনো গণভবনের দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে যাবো। পার্কের আলো-অন্ধকারের ভেতরে দু'জনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে টের পাই, আমরা চক্কর খেয়ে যাচ্ছি একই জায়গায়। গণভবনের গেট শুধু নয়, কোনো গেটই চোখে পড়ছে না, ক্রমাগত হেঁটে চলেছি। শেষ পর্যন্ত পার্কের বাইরে এসে কিছুক্ষণ বুঝতে পারিনি আমরা ঠিক কোথায়। রাস্তা, আশেপাশের বাড়িঘর সব অচেনা লাগে। দু'জনেই বিভ্রান্ত - কিছুই চিনতে পারি না! কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। পরে দু'জনে প্রায় একই সঙ্গে বুঝে ফেলি, আমরা গণভবনের উল্টোদিকের গেটে দাঁড়ানো!

এই রহস্যের কিনারা করা যায়নি। ভুলে-ধরা বলে একটা কথা শোনা ছিলো। আমাদের তাই হয়েছিলো? একই সঙ্গে? মানা যায়নি, এসব সংস্কারে আমাদের বিশ্বাস নেই।

আরেক দিনের ঘটনা। ১৯৮০ সালের। একটি লাল হোন্ডা ১১০-এ সওয়ার হয়ে তখন ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়াই। হাবিবকে নিয়ে ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে গোল্ডেন গেট-এ ঢুকেছি সন্ধ্যার খানিক পরে। ঘণ্টাদুয়েক পরে বেরিয়ে দেখি, তুমুল বৃষ্টি। ভেতরে বসে টের পাওয়া যায়নি। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। ওই তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে আমরা দু'জনে মোটর সাইকেলে চেপে বসি। রাস্তায় নেমে টের পাই, কাজটা ঠিক হয়নি। বৃষ্টিতে সামনে পাঁচ হাত দূরের জিনিসও ভালো করে দেখা যায় না। কী উপায়ে জানি না, আমরা যার যার ঘরে অক্ষত ফিরেছিলাম সে রাতে।

এখন পেছনে তাকিয়ে ঘটনা দুটিকে আশ্চর্য প্রতীকী বলে মনে হয়। আমরা তখন সত্যিই খানিকটা দিকভ্রান্ত, উদভ্রান্ত ছিলাম। বাইরের যাবতীয় প্রতিকূলতা ও বিপদসংকুলতার ভেতরে ছিলো আমাদের অনিশ্চিত যাত্রা।




১৯৭৫-এ একটি গল্প ডাকে পাঠিয়েছিলাম দৈনিক সংবাদ-এর রবিবাসরীয় পাতায় (তখনো রোববার ছুটির দিন)। বছর দুয়েক আগে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় এসেছি পড়তে। সম্পাদকের সামনে যাওয়ার সাহস তখনো হয়ে ওঠেনি। এক বা দুই সপ্তাহের মাথায় লেখাটি ছাপা হয়ে যায়। ঢাকার কোনো কাগজে আমার প্রথম গল্প। সচিত্রীকরণের কাজ দেখে মুগ্ধ আমি। জানা যায়, আঁকার কাজটি কাজী হাসান হাবিবের। নামে চিনি, বইয়ের প্রচ্ছদের কাজ করে হাবিব তখনই যথেষ্ট খ্যাতিমান। এক শনিবার বিকেলে হাসান হাফিজ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায় বংশালের সংবাদ অফিসে। হাবিবের সঙ্গে পরিচয় হয়। সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতের সঙ্গেও।

হাসনাত ভাইয়ের উদার প্রশ্রয়ে অবিলম্বে প্রতি শনিবার বিকেলে সংবাদ অফিসে আমাদের আড্ডা শুরু হয়। পাশের দোকান থেকে চা-ডালপুরি আসে। অধূমপায়ী হাসনাত ভাই সেই ছোটো ঘরটিতে পাঁচজন বিষম ধূমপায়ীকে কেমন করে সহ্য করতেন, জানি না। খানে একমাত্র কাজের কাজী হাসান হাবিব। আমরা উল্টোদিকে বসে তার কাজ দেখি, আড্ডা ছাড়া আমাদের সেখানে আর কোনো ভূমিকা নেই। হাবিবের তুলিতে ছবি, একেকটি অবয়ব ফুটে উঠতে দেখি। হয়তো আমাদেরই কারো লেখার ইলাস্ট্রেশন হচ্ছে। গল্পের ভেতর থেকে তুলে আনা কোনো দৃশ্য। আঁকিয়ের নিজস্ব ব্যাখ্যায় সে দৃশ্য নতুন অর্থ পেয়ে যাচ্ছে। তখনই প্রথম বুঝি, লেখক এবং চিত্রকরের দেখার চোখ আলাদা। সিরাজ একদিন বলেছিলো হাবিবকে, আমরা লেখালেখি যা করার চেষ্টা করি, তার সবটা আপনি বোঝেন। আমরা আপনার ছবি বুঝি না কেন? এই ব্যবধানটা ঘুচিয়ে ফেলা দরকার না?

হাবিব বলেছিলো, অবশ্যই। চেষ্টা করলেই সম্ভব।

সিরাজ-মিলন-সারোয়ারের কথা জানি না, আমি ছবি বুঝতে খুবই ব্যর্থ হয়েছিলাম। আমার অক্ষমতা।

শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমকে মেলানোর চেষ্টা ছিলো হাবিবের। প্রিন্ট গ্রাফিকস নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিলো, কিছু কিছূ করেওছিলো। তার দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ছিলো ছবি এবং কবিতাকে মেলানোর চেষ্টা।

হাবিবের জীবদ্দশায় কম্পিউটার যন্ত্রটি বাংলাদেশে জনপ্রিয় বা সহজলভ্য হয়নি। এই মাধ্যমটিকে পেলে হাবিব বাংলাদেশের মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পকে আরো অনেক দিতে পারতো, সন্দেহ নেই।




বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে মতিঝিল কলোনীর এক বাসায় পেয়িং গেস্ট হিসেবে বাস করেছিলাম মাস ছয়েক। হাবিবের পরোক্ষ যোগাযোগে তা সম্ভব হয়েছিলো। পরের ঠিকানা বেইলি রোডে। নতুন তৈরি বেইলি ডাম্প কলোনির একটি বাসা বরাদ্দ হয়েছিলো হাবিবের দুলাভাই তাজুল ভাইয়ের নামে। কলোনির সেই ছোট্টো দুই কামরার বাসা তাঁর জন্যে অনুপযুক্ত, সে বাসায় তিনি উঠবেন-কি-উঠবেন না করছেন। হাবিবের সুপারিশে সেই বাসায় আমার থাকার ব্যবস্থা হয়। কয়েকমাস পরে তাজুল ভাই ওই বাসায় উঠে আসার সিদ্ধান্ত নিলে আমার পরবর্তী বাসস্থান হয় কলাবাগানে - হাবিবের বাসার দুশো গজের মধ্যে। হাবিব ২৯ উত্তর ধানমণ্ডি, আমি ৫০/ক। সাল ১৯৮০।

তখন মধ্যরাতের পরে ঢাকায় কারফিউ জারি ছিলো, জনগণনন্দিত সরকারের 'নিরাপত্তা হই' উপহার! পঁচিশ-ছাবি্বশ বছরের যুবক, যে তখনো সংসারী নয়, নিরাপত্তা তার কী কাজে লাগবে! তার চাই ইচ্ছেমতো চলাফেরার অধিকার। মধ্যরাতের পর বাইরে থাকা খুব জরুরি, এমন নয়। কিন্তু ইচ্ছে হলেও বেরোনো যাবে না, এই বোধের মধ্যেই তো শ্বাস বন্ধ করে ফেলার অবস্থা!

রাত বারোটায় কারফিউয়ের আগে কলাবাগান এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়ি। নিজের ঘরে ফেরার আগে হাবিবের ঘরে আড্ডা। কলাবাগানের ছোটো গলিতে কারফিউ না মানলেও চলে। হাবিব তখন ক্যানভাসের সামনে বসছে। কথা বলতে বলতে রং মেশাচ্ছে, সেই রং ক্যানভাসে উঠে আসছে। ফুটে উঠছে বিষণ্ণ নারীমূর্তি, একটি খোলা জানালা, ছুটন্ত শিশু, উদার নীল আকাশের এক কোণে খুব চেনা একটি চাঁদ। চাঁদ বিষয়ে হাবিবের বিশেষ দুর্বলতা ছিলো। স্ত্রীর নাম জ্যোৎস্না বলেই কি? ঠাট্টাও হতো এই নিয়ে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, গোঁফের তলায় মিটিমিটি হাসতো সে।

আঁকতে বসে গান শোনার অভ্যাস হাবিবের। সব ধরনের গানেরই কান ছিলো তার। ইংরেজি গানের ভেতরে সে-ই আমাকে নিয়ে যায়। বাংলা গানে অভ্যস্ত কানে ইংরেজি গানকে অর্থহীন চিৎকার মনে হতে পারে, আমারও হতো। অভ্যস্ত করে তোলার জন্যে সে আমাকে একে একে শুনতে দেয় কারপেনটারস, ক্লিফ রিচার্ডস, বীটলস। ভ্যান গখকে নিয়ে ডন ম্যাকলীনের 'ভিনসেন্ট' (স্টারি স্টারি নাইট), পিংক ফ্লয়েডের 'ডার্কসাইড অব দ্য মুন', সায়মন অ্যান্ড গারফাংকেল-এর 'ব্রীজ ওভার ট্রাবলড ওয়াটার' বা 'সাউন্ড অব সাইলেন্স' প্রথম শুনেছিলাম হাবিবের ছবি আঁকার ঘরে। বীটলস-এর 'লুসি ইন দ্য স্কাই উইথ ডায়মন্ডস' সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলো, একেবারে বিশুদ্ধ পরাবাস্তব, কয়েক লাইনের একটিমাত্র গানের ভেতরে যে কতো ছবি! এইসব ছবি হাবিব দেখতে পেতো, আমি পেতাম না। আমি শুনতাম। এই পনেরো বছর পরেও ভুল হয়ে যায় আমার, কোনো একটি গান ভালো লাগলে মনে হয়, হাবিবকে যদি শোনাতে পারতাম!

১৯৮২-র এক সকালে হাবিব মলিন মুখে আমার বাসায় আসে। বিকেলে আর্ট কলেজে তার প্রথম একক প্রদর্শনীর উদ্বোধন। একটি বিষয়ে তার উদ্বেগের কথা আমার জানা ছিলো। প্রদর্শনীর পুস্তিকা ছাপার দায়িত্ব যিনি নিয়েছেন, সেই ভদ্রলোককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগের রাত পর্যন্ত পুস্তিকা দূরে থাক, কাজটি আদৌ হয়েছে বা হচ্ছে কি না তা-ও জানা যায়নি।

আমার বিছানায় বসে দু'হাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলে সে। ব্যাপারটি আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। হাবিবকে এমন বিপন্ন দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। প্রজ্ঞা ও স্থিরতার জন্যে আমরা বরাবর তার শরণাপন্ন হই। সেই হাবিবকে এম বিপন্ন দেখে এখন আমি কী বলি! আমার ধারণা হয়, পুস্তিকা সম্ভবত আদৌ তৈরি হয়নি। একজন আঁকিয়ের জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনীর আবেগ-উত্তেজনা অনুমান করা যায়। কোনো কথা বলার সাহস হয় না। কিন্তু ঘটনা আমার অনুমানকে পরাস্ত করে। হাবিব খামের ভেতর থেকে একটি পুস্তিকা বের করে দেয়। তার প্রদর্শনীর। শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়ে এলেও গণ্ডগোল সেখানেই। ছবির রং সব ওলটপালট হয়ে গেছে, মূল ছবির সঙ্গে কোনো মিল নেই। জীবনের প্রথম প্রদর্শনী নিয়ে এরকম ঘটলে যে কারো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। চিত্র প্রদর্শনীর পুস্তিকায় ছবির রংগুলো লোপাট হয়ে গেলে তার চেয়ে অর্থহীন আর কী হয়! হাবিব স্বগতোক্তির মতো বলে, এই জিনিস কারো হাতে দেওয়া যায়!

প্রথমটি শেষ হওয়ার পরপরই হাবিব আঁকতে শুরু করে পরের প্রদর্শনীর জন্যে। তার বিষয় নির্বাচনটি অভিনব ছিলো - বাংলাদেশের কয়েকজন প্রধান কবির একটি করে কবিতাকে ছবিতে তুলে আনা। পত্রিকার ইলাস্ট্রেশন ও বইয়ের প্রচ্ছদ করে হাবিব খ্যাতিমান হয়েছিলো, কিন্তু এগুলিকে শিল্পবোদ্ধারা সচরাচর কমার্শিয়াল বা অনুল্লেখ্য কাজ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। হাবিবের চেষ্টা ছিলো, ইলাস্ট্রেশনকে শিল্পের স্তরে তুলে আনা। এই কাজগুলি তার সেই চেষ্টার ফসল, তার নিজস্ব প্রতিবাদ। প্রায় তিন বছর ধরে ছবিগুলো এঁকেছিলো সে। ছবির গুণাগুণ বিচারের সাধ্য আমার ছিলো না, কিন্তু রাতের পর রাত তার সৎ ও সযত্ন পরিশ্রমের সাক্ষী আমি।




হাবিব চলে গেলো, সেই শীতকালেই আকস্মিকভাবে কাজী টুলুর সঙ্গে দেখা। টুলু হাবিবের ছোটো ভাই, আমেরিকাবাসী সে আমারও আগে থেকে। হাবিবের শেষ দিনগুলোর একটি ভিডিও কেউ করেছিলো, সেটি দেখায় টুলু। চমকে উঠি, এই হাবিবকে আমি চিনি না! শীর্ণকায় সে বরাবর, কিন্তু সুস্বাস্থ্যের দ্যুতি ছিলো তার শরীরে। ভিডিওতে কঙ্কালপ্রায় হাড়সর্বস্ব একটি মানুষকে দেখি, মাথাভরা কোঁকড়া চুল ঝরে গিয়ে যা অবশিষ্ট আছে তা হয়তো আঙুলে গোনা যায়। মায়াবী চোখগুলি ক্লান্ত, অবসাদমাখা। নিজের কথাগুলো আপনমনে বলে যায় হাবিব। বললো নিজের জীবনদর্শনের কথা, বোধ ও শিল্পবিশ্বাসের কথা। অনুমান করা চলে, সব কথা নিশ্চয়ই বলা তার হয়নি। যা হয়নি তা আর কোনোদিন বলা হবে না, আমাদের অজানা থেকে যাবে।

কবি রফিক আজাদ আমাকে একদিন বলেছিলেন, হাবিবের অসাধারণ মানসিক শক্তিকে অভিবাদন করতে হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বেশিরভাগ মানুষই কিছু কাতর হয়, সারাজীবনের বিশ্বাস বিসর্জন দিয়ে হলেও হয়তো কিঞ্চিৎ ধর্মমুখী হয়ে পড়ে। হাবিব আপস করেনি, মৃত্যুকে একটুও ভয় পায়নি। পরাজয় স্বীকারের কোনো চিহ্ন তার মধ্যে ছিলো না। নিজের বিশ্বাসের ভিতটি অনেক বেশি শক্ত ছিলো, শেকড় ছিলো অনেক গভীরে। সাহসী বীরের মতো মাথা উঁচু করে চলে গেছে সে!




হাবিব, আপনাকে নিয়ে গুছিয়ে কিছু লেখা আসলে অসম্ভব আমার পক্ষে। কতো যে টুকরো কথা, টুকরো ছবি মনে আসে! কোনটা ছাড়ি, কোনটা লিখি!

অনন্ত তখন বছর পাঁচেকের। এক সন্ধ্যায় সে আপনার কোলে বসে বলেছিলো, ক্যাডবেরি কাকু (ওর জন্মদিনে কী দেবো ভেবে না পেয়ে এক বাক্স ক্যাডবেরি কিনে দেওয়ার সুবাদে আমার ওই নামকরণ হয়েছিলো), আমার বাবা সবার চেয়ে বড়ো! অনন্তর কথায় আপনি হেসেছিলেন, তাতে তৃপ্তি ও অহংকার ছিলো। আমি বলেছিলাম, ছেলে যদি পঁচিশ বছর বয়সেও এই কথা বলে তাহলেই আপনি জিতে গেলেন। হায়, অনন্তর পঁচিশ বছর হওয়া পর্যন্ত তো আপনি অপেক্ষা করলেন না!

দেশান্তরী হবো, গোছগাছের সময় আপনার দ্বিতীয় প্রদর্শনীর পুস্তিকার একটি কপি সঙ্গে নিয়েছিলাম। কেন, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। সেটি এখনো আমার পড়ার টেবিলে আছে। প্রকাশ্যে নয়, যদি নষ্ট হয়ে যায়! কিন্তু বই ও কাগজপত্রের মধ্যেই আছে, আমি চোখ বন্ধ করে হাত বাড়ালেও ঠিক পেয়ে যাবো। তার সঙ্গে আছে বিচিত্রা থেকে কেটে রাখা শাহরিয়ার কবিরের লেখা 'কাজী হাসান হাবিবের ইচ্ছামৃত্যু' শিরোনামের লেখাটি। আছে একটি কার্ড। আপনার অসুস্থতার খবর জেনে কিনেছিলাম। পাঠানো হয়নি, সেজন্যে কোনো দুঃখবোধ নেই কিন্তু। কার্ড পৌঁছাতে যা সময় লাগতো তার আগেই আপনার ঠিকানা বদলের সময় হয়ে গিয়েছিলো, সে ঠিকানা ডাক বিভাগের অধিগম্য নয়। আপনাকে খুব মনে পড়লে এগুলো বের করে দেখি। অসংখ্যবার পড়া, তবু শাহরিয়ার কবিরের লেখাটি পড়তে গেলে আজও চোখ ভিজে যায়।

এখন সিরাজ-মিলন-সারোয়ারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। অনুপস্থিত হাবিবের কথা উঠলে অজান্তে কখনো চুপ হয়ে যাই আমরা। এই তো সেদিনও সারোয়ারের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম, আপনার কথা বলতে গিয়ে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলো পিতৃহীন শিশুর মতো। এই পনেরো বছর পরেও! আপনি জিতে গেছেন, আপনার জন্যে ঈর্ষা তাই খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া!

আমার আমেরিকাযাত্রার দিন এয়ারপোর্টে এসেছিলেন আপনি। বললেন, যাচ্ছেন কিন্তু ফিরে আসার জন্যে। কথা দিয়েছিলাম, ফিরবো। সতেরো বছর হয়ে গেছে, আমার কি ফেরার সময় হলো, হাবিব? আপনাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা আর কেউ জানে না। আপনিও আর মনে করিয়ে দেবেন না। ফিরবো তবে কার কাছে? কাকে বলবো, কথা রেখেছি?

-----------------
ডিসেম্বর ২০০৩
-----------------

Wednesday, October 24, 2007

আমাদের সুরাইয়া খানম

সুরাইয়া খানম চলে গেলেন গত ২৫ মে। আমেরিকার মরুময় রাজ্য আরিজোনার একটি শহরে তিনি বাস করতেন জানতাম। হয়তো দুরূহ ছিলো না, তবু যোগাযোগ করা হয়নি তাঁর সঙ্গে। খবর এলো কিছুটা গুজবের মতো, বিশ্বাস হয়নি বা করতে চাইনি বলেই হয়তো গুজব মনে হয়েছিলো। ৬০ আর কী এমন বয়স যে চলে যেতে হবে?

কবি বদিউজ্জামান নাসিম জানালেন, সুরাইয়া খানমের মৃত্যুসংবাদ-সংবলিত একটি ইমেল পেয়েছেন তিনি। অনেককে ফোন করেছেন, নিশ্চিত হতে পারেননি। জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিছু শুনেছি কি না। জানতাম না। জানলাম জনকণ্ঠে মাহবুব তালুকদারের লেখায়। তাতে উল্লেখ ছিলো, ওই কাগজের শোক সংবাদ বিভাগে খবরটি ছিলো। কয়েকটি বাংলা সংবাদপত্র প্রতিদিন ইন্টারনেটে পড়া হলেও শোকসংবাদে আমার কী কাজ? কিন্তু সুরাইয়া খানমের চলে যাওয়ার সংবাদটি যে সেখানেই পাওয়া যাবে, কে জানতো!

১৯৭৩-এ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় সুরাইয়া আপা ছিলেন না, শিক্ষক হয়ে এলেন ওই বছরের শেষের দিকে অথবা ৭৪-এর শুরুতে। ক্যামব্রিজে পড়া বিদুষী এবং অসামান্য রূপসী সুরাইয়া খানম সাড়া জাগালেন অবিলম্বে। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে মহিলা শিক্ষকদের আপা বলে সম্বোধন করার প্রচলন ছিলো না। ম্যাডাম বলা হতো, সম্ভবত এখনো হয়।

সেই হিসেবে সুরাইয়া খানমকে আমারও ম্যাডাম সম্বোধন করার কথা। হয়নি, তার পেছনে আমার ছোটো বোন ঝর্ণার খানিকটা অপ্রত্যক্ষ ভুমিকা ছিলো। ঝর্ণা থাকতো শামসুননাহার হলে, সুরাইয়া খানম সেখানে হাউস টিউটর হয়ে এলেন। তাঁর জন্যে আলাদা আবাস বরাদ্দ হলো না। অথবা করতে পারলো না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনি তখন সংসারী নন, একা মানুষ। তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো ছাত্রীদের জন্যে নির্ধারিত একটি কক্ষে।

রুম নম্বর ২৪০। ঠিক পাশেই ২৩৯-এর বাসিন্দা ঝর্ণার সঙ্গে তাঁর কিছু ঘনিষ্ঠতা হয়। ঝর্ণার জন্যে তাঁর বরাদ্দ প্রশ্রয়ের কিছু আমার ভাগে এসে পড়ায় তিনি সুরাইয়া আপা হয়ে গিয়েছিলেন। ক্লাসে আমার নিয়মিত অনুপস্থিতির ফলে বেশি যোগাযোগ ছিলো না, ছাত্র হিসেবে আমার নিতান্ত অনুজ্জ্বলতাও হয়তো একটি কারণ।

স্নব বলে আমাদের ইংরেজি বিভাগের খ্যাতি ছিলো, হয়তো এখনো আছে। ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য, নিয়ে কথা বলবে বা চর্চা করবে তা যেন খুব নিম্নমানের কাজ, জাত খোয়ানোর মতো নিন্দনীয় অপরাধ।

ব্যতিক্রম অবশ্য সবখানেই থাকে, ইংরেজি বিভাগে নিম্নবর্গীয় সেই সংখ্যালঘুদের একজন ছিলেন সুরাইয়া খানম। নিজে কবিতা লিখতেন, তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘নাচের শব্দ’ প্রকাশিত হয়েছিলো সত্তর দশকের মাঝামাঝি। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রাজিয়া খান ও সেলিম সারোয়ার এবং কিছু পরের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কাশীনাথ রায় ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন। সেই সময়ের ইংরেজির ছাত্রদের মধ্যে নূরুল করিম নাসিম ও শিহাব সরকার লেখালেখিতে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বলে মনে পড়ে।

অন্যসব ক্লাসের মতোই সুরাইয়া আপার ক্লাসেও আমার বারকয়েকের বেশি যাওয়া হয়নি। তিনি কী পড়াতেন, তা-ও মনে নেই। অমনোযোগী ছাত্র হলে যা হয় আর কি। আরেকটি কারণ স্বীকার করে নিতে সংকোচ নেই। প্রিয়দর্শিনী সুরাইয়া আপার ছিলো দৃপ্ত ও দৃঢ় বাচনভঙ্গি এবং প্রখর ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা। যে কয়েকবার তাঁর ক্লাসে উপস্থিত হয়েছি, হয়তো এইসব গুণাবলিই বেশি চোখে পড়েছে, বিদ্যা অর্জন গৌণ।

ক্লাসের বাইরে বারকয়েক তাঁর অফিসে গিয়েছি। একা বা দুয়েকজন বন্ধুবান্ধবসহ। তাঁর রূপ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ আমার দুই লাজুক সহপাঠী কীভাবে যেন আবিষ্কার করে ফেলে যে, সুরাইয়া আপার সঙ্গে আমার সামান্য যোগাযোগ আছে। তাদের খুব ইচ্ছে তাঁর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা, কিন্তু কীভাবে সম্ভব জানে না।

মনে আছে, মধুর ক্যান্টিনে চা-সিঙাড়ার বিনিময়ে দুই গুণমুগ্ধকে এক দুপুরে তাঁর অফিসে নিয়ে যাই। সেই সাক্ষাতের সময় একটি মজার ঘটনা ঘটেছিলো। দুই সহপাঠী বন্ধুকে নিয়ে সুরাইয়া আপার কক্ষে গিয়ে দেখি তাঁর উল্টোদিকের চেয়ারে বসা আমাদের দুই-এক বছরের কনিষ্ঠ চশমা-পরা একটি মেয়ে বসে এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। সুরাইয়া আপা আমাদের বসতে ইঙ্গিত করে মেয়েটির কথায় হুঁ হাঁ করে যাচ্ছিলেন।

সে মেয়ের কথা আর থামেই না। তার একটি কথা এখনো আমার মনে আছে। সে সাহিত্যে কতোটা নিবেদিতপ্রাণ তা বোঝাতে গিয়ে জানায়, ‘জানেন ম্যাডাম, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ সাহিত্যচর্চা না করলে আমার ঘুমই আসে না!’ সুরাইয়া আপার মুখে কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখলাম।

তাঁর অফিসে গেলে কথা হতো বাংলা সাহিত্য নিয়ে। ঠিক আড্ডা বলা চলে না, আপা ডাকলেও শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কজনিত দূরত্ব কিছু ছিলোই। যোগাযোগটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কথাবার্তায় তাঁকে খুব আবেগতাড়িত মানুষ বলে মনে হতো। কথা বলতেন সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের গভীর থেকে। অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ছিলেন, যা তাঁকে কিছু মানুষের চোখে অপ্রিয়ও করে থাকবে।

সুরাইয়া আপার আরেকটি কীর্তির কথা অনেকের জানা নেই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয়ের পর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়্যারে বাঙালিদের বিজয় অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকাটি উত্তোলিত হয়েছিলো তাঁরই হাতে।

১৯৭৫-এর ২৬ নভেম্বর। সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে খবর পাওয়া গেলো, তরুণ কবি আবুল হাসান প্রয়াত। তাঁর কবিতা আমার প্রিয়। আবুল হাসান দীর্ঘকাল অসুস্থ ছিলেন, সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসার জন্যে তাঁকে পাঠানো হয়েছিলো বার্লিনে। যতোদূর জানি, একজন কবির চিকিৎসার জন্যে সরকারি তৎপরতা ও সহায়তার ঘটনা বাংলাদেশে সেই প্রথম।

ফিরে আসার পর হাসান অল্প কিছুদিন ভালো ছিলেন, তারপর তাঁকে আবার পি জি হাসপাতালে (এখন শেখ মুজিব হাসপাতাল) ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসকরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, সুরাইয়া আপা ছাড়েননি। আবুল হাসানের সঙ্গে সুরাইয়া আপার বন্ধুত্ব বা ততোধিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো, এই মর্মে কথাবার্তা শোনা যেতো। সেসব অবান্তর, কবির সেই শেষ সময়ে সুরাইয়া খানম অবতীর্ণ হয়েছিলেন মমতাময়ীর ভূমিকায়।

প্রিয় কবির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লাস করতে যাওয়া যায় না। পি জি হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম উদভ্রান্ত সুরাইয়া আপাকে, প্রয়াত কবির বিছানার পাশে দাঁড়ানো। তাঁকে অমন করুণ ও অসহায় আগে কোনোদিন দেখিনি। কিছু কিছু ছবি চিরকালের মতো হৃদয়কন্দরে জেগে থাকে, আজও সে মুখ ভোলা হয়নি।

কবির বন্ধু-আত্মীয়-ভক্তরা তখন ধীরে ধীরে সমবেত হচ্ছেন পি জি হাসপাতালে কবির অন্তিম শয্যাটিকে ঘিরে। অতো মানুষের সংকুলান সেই ছোট্টো কক্ষে হওয়ার কথা নয়, আমরা কেউ কেউ বাইরে বারান্দায় দাঁড়ানো। সুরাইয়া আপা হঠাৎ বেরিয়ে এলেন। কী ভেবে কে জানে, আমার হাত ধরে বললেন, ‘ওরা হাসানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তা কিছুতেই হতে পারে না, হাসানের খুব ইচ্ছে ছিলো তার কবর হবে রেসকোর্সের একপাশে। সে বলে গেছে। আমার কথা কেউ শুনছে না, তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে ওদের?’

জীবনে একেকটা অসহায় সময় আসে যখন মানুষ খুব অবুঝ ও যুক্তিহীন হয়ে যায়। তখন অতি সামান্য কিছুকেও শক্ত অবলম্বন ভাবতে ইচ্ছে করে। না হলে এতো মানুষ থাকতে সুরাইয়া আপা আমাকে এই অনুরোধটি কেন করবেন? আমার কী ক্ষমতা, আমি তো সত্যিই কেউ না, আমার কথা কে শুনবে? তাঁর তখন সেসব বিবেচনা করার অবস্থা নেই।

বুঝতে পারি, অনেকের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়ে সবাইকে তিনি একই অনুরোধ করে যাচ্ছেন, হাসানের কবর যেন ঢাকায় হয়। হঠাৎ রাহাত খানকে দেখতে পাই। আমি সুরাইয়া আপাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। বলি, ‘রাহাত ভাই কিছু একটা করতে পারবেন হয়তো।’

নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে সরে এসেছিলাম সেদিন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আর কোনোদিন হয়নি। পেরে উঠিনি। সুরাইয়া আপা একটিমাত্র অনুরোধ করেছিলেন, যা রক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিলো না।

একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে মেয়েদের মেধা ও সৌন্দর্যের সম্মিলন কম দেখা যায়। হয়তো খুব অমূলক নয়। কিন্তু সুরাইয়া খানম সেই সংখ্যালঘুদের একজন যাঁর মধ্যে মেধা, প্রতিভা ও সৌন্দর্য এক হয়ে মিশে গিয়েছিলো। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, রূপসী নারী হিসেবে তিনি যতো প্রচারিত হয়েছেন, মেধাবী শিক্ষক বা প্রতিভাবান কবি সুরাইয়া খানমকে নিয়ে আলোচনা সে তুলনায় ততোটাই কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে প্রবাসী হয়েছিলেন আশির দশকের শুরুতে। বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন, স্বামী সৈয়দ সালাউদ্দিন এক দুর্ঘটনায় মারা যান বছর দুয়েক আগে। তাঁর মেয়ে সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করেছে, স্বামীসহ ওয়াশিংটন ডি সি-তে বাস করে। সুরাইয়া আপা শেষের দিনগুলিতে সম্পূর্ণ একা ছিলেন শুনেছি। তাঁরও সময় ফুরিয়ে গেলো।

বিদায়, সুরাইয়া আপা। আপনার অন্তর্ধানের খবরে ঝর্ণা বলছিলো, কারণে-অকারণে প্রায়ই আপনাকে তার মনে পড়ে। আপনাকে সে ভোলেনি (‘অমলকে বোলো, সুধা তাকে ভোলেনি!’)। আপনার সম্পর্কে তার শেষ কথা, আপনি সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রবর্তী ছিলেন।

আপনার আরেক ছাত্র, আমার বন্ধু বিক্রম ইমেলে জানালো, তাদের ‘পদাতিক’ পত্রিকার জন্যে একটি কবিতা দিয়েছিলেন আপনি। আপনার স্বহস্তে লেখা মূল কপিটি তার কাছে রক্ষিত ছিলো দীর্ঘদিন। এখন খুঁজে না পেয়ে তার অনুশোচনার শেষ নেই। আপনাকেও তো আর পাওয়া যাবে না।

সবশেষে আমার কথাটুকু জানিয়ে রাখি, যতোদিন আয়ু অবশিষ্ট আছে, বছরে অন্তত একবার হলেও আপনাকে মনে পড়বে। আপনার চলে যাওয়ার দিনটির খুব আশেপাশেই যে আমার জন্মদিন। ভুলি কী করে?

--------------
জুন ২০০৬
--------------

Tuesday, October 23, 2007

এইডা কি করলেন, ওস্তাদ!

২০০৫-এর ২২ মার্চ কবি আবিদ আজাদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পরপরই এই লেখাটি লিখেছিলাম। অসময়ে চলে যাওয়া আমাদের সতীর্থ বন্ধুটিকে মনে রেখে এই রচনা।




এইরকম কথা ছিলো না, ওস্তাদ। তবে কী কথা যে ছিলো, জিজ্ঞাসা করলে কিন্তু বিপদ। দিনতারিখের লেখাজোখা নাই, মুখে বইলা-কইয়াও হয় নাই, এইসব না-লেখা না-বলা চুক্তির বিষয় - হাওয়ায় কথা চালাচালি। আপনে ঠিকই বুঝবেন।

এখন দেশে গেলে আপনের সাথে আরেকবার দেখা হইবো না, ঢাকা শহরের কোনোখানে আপনে আর নাই। 'শিল্পতরু'-র সাইনবোর্ড তখনো হয়তো ঝুইলা থাকবে, কিন্তু আমার আর সেইখানে যাওয়ার উপায় নাই। কার জন্যে আর যাই? আপনেই লিখছিলেন : যে শহরে আমি নেই, আমি থাকবো না ... আর তোমার মনে হবে, আমি নেই।

মনে কিন্তু এখনই হইতেছে। আপনেরা যারা কবিতা-উবিতা লেখেন ওস্তাদ, অনেকদূরের না-জানা না-দেখা জিনিসও ক্যামনে জানি বুইঝা ফালাইতে পারেন! অবাক মানতে হয়। কিন্তু এতো জলদি কাট মারবেন তা একবারও কন নাই, আমরাও বুঝি নাই। বিদায় দেওয়া-নেওয়ার একটা দস্তুর আছে না?

আপনের সঙ্গে একখান বোঝাপড়ার মামলা ছিলো যে! একদিক দিয়া দেখলে তেমন কিছু না, আমার কাছে কিন্তু অনেকখানি। আপনেরে জিজ্ঞাসা করি তারও কায়দা নাই। করলেন কি, ওস্তাদ? এইডা কি কিছু হইলো, আপনেই কন!




আবিদ আজাদের তিরোধানের খবরে কথাগুলো মনে আসে। এই ভাষায়ই কথা হতো। ঢাকায় অনেক কবি-লেখকদের মধ্যে পরস্পরকে ওস্তাদ সম্বোধন করার একটি প্রথা তখন চালু ছিলো, এখনো আছে কী না জানা নেই। আবিদ প্রায় সবাইকেই ওস্তাদ সম্বোধন করতে ভালোবাসতেন, শব্দটি তাঁর তাম্বুলরঞ্জিত ঠোঁটের ডগায় লেগেই থাকতো।

ঢাকা থেকে ছোটো ভাইয়ের ইয়াহু ইনস্ট্যান্ট মেসেজ : 'আমাদের সময়ের একমাত্র পান খাওয়া কবি আবিদ আজাদ আর নেই'!

অসম্ভব! জবাবে এই শব্দটিই টাইপ করি, অনেকটা অজান্তে। জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছিলো?

আসলে অর্থহীন প্রশ্ন। কী হবে আর জেনে? নেই কেন সেই পাখি নেই কেন...? নেই যে, সেটিই সবচেয়ে বড়ো সত্য। বিশ্বাস না হলে কিছু এসে যায় না, মানতে না চাইলেও তা পাল্টাবে না। আবিদ প্রশ্নাতীতভাবে আমার প্রজন্মের সবচেয়ে উজ্জ্বল কবি। তাঁর কবিতা কালের বিচারে টিকে যাবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আমরা আরো অনেকদিন আবিদকে পড়বো, তা নিঃসন্দেহে জানি। কিন্তু আমার বন্ধু, কিছু দূরের হলেও বন্ধুই, আবিদ আর কোথাও নেই।

আবিদের সঙ্গে অনেক বছর যোগাযোগ ছিলো না। দোষ তাঁর নয়, দেশান্তরী আমি আজ ঊনিশ বছর হয়-হয়। কিছুকাল ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন, দুয়েকবার হাসপাতালও ঘুরে এসেছেন, সামপ্র্রতিক কবিতায় সেসব খবর পাওয়া যাচ্ছিলো। তবু চলে যাওয়ার মতো গুরুতর অসুস্থ, তা জানা হয়নি। শুধু আমি কেন, তার ঘনিষ্ঠতমদের একজন মাহবুব হাসান, যিনি শেষদিন পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন, জানালেন আবিদের প্রস্থান আচমকা ও অপ্রত্যাশিত।

তবু শেষ কথা এই, আবিদ চলে গেলেন।




পরিচয় কীভাবে হয়েছিলো মনে পড়ে না। প্রয়োজনই বা কি? সময় ৭৪ বা ৭৫-এর কোনো একদিন। স্থান শরীফ মিয়া বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি-সংলগ্ন এলাকার বাইরে কোথাও হওয়া সম্ভবই নয়। ওই অঞ্চল তখন আমাদের দিনরাত্রির চারণক্ষেত্র - ওখানেই চরি-ফিরি, খাই-দাই গান গাই তাইরে নাইরে না, আড্ডা দিই, যে কোনো বিষয়ে উচ্চকণ্ঠে তর্ক করি। মনে পড়ে, গুটিপোকারূপী সুমন সরকার তখন রূপান্তরিত হচ্ছেন প্রজাপতি আবিদ আজাদ হিসেবে। সেই হালকা-পলকা গড়নের মাঝারি উচ্চতার আবিদ প্রতিভা ও বা কবিত্বশক্তির বিচারে অনেক বড়ো উচ্চতাকেও অতিক্রম করেছিলেন অনায়াসে। গোঁফের তলায় তার মৃদু হাস্যময় মুখ ভোলা যাবে কোনোদিন? চোখেমুখে তখনো সদ্য কৈশোরের সরলতা ও মুগ্ধতা। আমি তাঁকে বলতাম কিশোরগঞ্জের কবি-কিশোর।

কবি আবিদ অসাধারণ অনুভূতিপ্রবণ, হৃদয়-নিংড়ানো আবেগের নির্যাস তাঁর একেকটি কবিতা। একদিন শরীফ মিয়ায় বসে বলেছিলেন, আমরাই পৃথিবীর শেষ রোম্যান্টিক, ওস্তাদ। এমন দিন আসবে যখন রোম্যান্টিকতার নামগন্ধও কোথাও থাকবে না।

তাঁর সঙ্গে কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা হয় শহীদ কাদরী ও মাহবুব হাসানের সঙ্গে মিলিত হয়ে আবিদের বাণিজ্য অভিযানের সময়। সত্তর দশকের শেষভাগে তিন কবির উদ্যোগে আজিমপুর এলাকায় 'ত্রিকাল' নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা পায়। আড্ডার লোভে যাওয়া-আসা হতো। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘায়ু হয়নি, কবিদের বাণিজ্যঘটিত প্রতিভা বিষয়ে সাধারণভাবে প্রচলিত ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করেই। আবিদ অবশ্য হাল ছাড়েননি। আগাপাশতলা কবি হয়েও মুদ্রণ ব্যবসায়ে সফলভাবে টিকে ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সুবাদে কিছু স্বপ্নসম্ভবও ঘটে - সাহিত্য পত্রিকা 'কবি' ও 'শিল্পতরু' প্রকাশে এবং প্রকাশনা ব্যবসায় সাফল্যে।

'ত্রিকাল'-এর কালেই আবিদের প্রথম কবিতার বই ঘাসের ঘটনা প্রকাশ পায়। প্রুফ দেখার সময় হানাবড়ির গান (আঘাত করো আঘাত করো দেখবে কিছু নেই...) কবিতাটি আমার ভালো লেগে যায়। আবিদকে জানালে লাজুক কবির ফর্সা মুখ নিমেষে লালচে হয়ে ওঠে - কী যে কন, ওস্তাদ!

বই প্রকাশিত হলে আশ্চর্য হয়ে দেখি, হানাবাড়ির গান কবিতাটি আমাকে উৎসর্গ করেছেন কবি। কোনো কবিবন্ধুর আমাকে কবিতা উৎসর্গ করার ঘটনা সেই প্রথম এবং শেষ। আবিদ আমাকে আবেগাপ্লুত ও কৃতার্থ করেছিলেন। অভিভূত হই ব্যাপারটি নিঃশব্দে ও আমার অজান্তে ঘটেছিলো বলে। অথচ এই নিয়েই তাঁর সঙ্গে একটি বোঝাপড়া আমার বাকি রয়ে গেলো। ঘাসের ঘটনা-র পরবর্তী এক সংস্করণে দেখি হানাবাড়ির গান কবিতার উৎসর্গটি উধাও। কোনো অভিমান বা অনুযোগ নয়, আবিদকে শুধু জিজ্ঞেস করার ছিলো, উৎসর্গ কি ফিরিয়ে নেওয়ার জিনিস, ওস্তাদ?

এই প্রশ্নটি এখন আর করি কাকে? আবিদ যে আমাকে সুযোগ দিলেন না, এটিই বরং অনুযোগ হয়ে থেকে যাক। অনন্তকাল ধরে। ঠিক যেভাবে কিশোরগঞ্জের কিশোর কবির সলজ্জ হাসিমুখ আমার ভিতরে খোদাই হয়ে আছে।




বন্ধুবিয়োগের সংবাদ কবে আর কার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো? মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য জেনেও বন্ধুর মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হওয়া সম্ভব নয়। এইসব মৃত্যু আমার আত্মার একেকটি খণ্ডাংশ ছিঁড়ে নিয়ে যায়। এক মনুষ্য হৃদয় আর কতোটা নিতে পারে?

বস্তুত সব মৃত্যুই শেষ বিচারে অনাকাঙ্খিত ও শোকময়। তবু প্রায় সমবয়সী বন্ধুর প্রয়াণ আমাদের শেকড় ধরে টান দেয়। এমন বয়সে উপনীত হয়েছি যে আমাদের পূর্বের প্রজন্মের কারো মৃত্যু, তা যতো শোকাবহ হোক, অনেকটাই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। অথচ আবিদের বিদায় মানে তো আমার কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখার সময় হয়ে যাওয়া - বাকি আর কয় ঘড়ি?

কবি আবিদ আজাদের চলে যাওয়ার দুই বছর

আবিদ আজাদ চলে গেলেন, আজ তার ঠিক দুই বছর পূর্তি। সত্তর দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি তিনি। তাঁর একটি কবিতা ব্লগারদের উদ্দেশে আজ নিবেদন করি। এর চেয়ে ভালো করে আর কীভাবে তাঁকে স্মরণ করতে পারতাম? এই কবিতার চেয়েও উৎকৃষ্ট কবিতা আবিদ লিখেছেন, কিন্তু একমাত্র এটিই এখন আমার হাতের কাছে আছে।



যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না
আবিদ আজাদ


যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে যুদ্ধ শেষের
ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্ট-পরা বুড়ি
বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা;
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা
লতাগুল্মময় ক্রেনের কংকাল, জং পড়া লোহালক্কড় আর হিংস্র
ঘাসের মধ্যে ধু-ধু করবে তোমার জীবন
ভয়ার্ত সব মিলিটারী ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত-বিক্ষত
একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো

তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা ছম-ছম করা জ্যোৎস্নায়।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে জনহীন কোন
পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে
একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে হা-হা করবে নিদাঘ রাত
দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাঁটল দিয়ে মাথা
তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ
শুনবে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো
আগুনলাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে
প্রেত হাসির শব্দ
আর তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে প্রতিদিন
দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর
সকাল সাতটা থেকে অনবরত টেলিফোনে আসতে থাকবে
'সান স্ট্রোকে'র সংবাদ
তোমার পাশের সাততলা জানলা থেকে লাফিয়ে পড়বে
কোঁকড়া চুলের যুবক
একদিন গলায় খুর চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো
সবুজ রঙের গলাবন্ধ পরে স্টিক হাতে যিনি মর্নিংওয়াকে
বেরুতেন রোজ
একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে নেবে ব্লেড
গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রীটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে
কালো রঙের একটা গাড়ি
একজন মানুষ শিরীষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আরকেজন মানুষের গলা
পার্কের ঝরাপাতার উপর সারারাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে
মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে চরম
দুবোর্ধ্যতম হয়ে বেড়ে উঠবে তোমার বিষণ্ণ সন্তান
বার বার ক'রে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস
তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে

কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনদিন ফিরে আসবে না
নীল হাফ প্যান্ট পরা তোমার ছেলে, আসবে না, আসবে না
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল বাড়ির সামনে : রাস্তার ওপারে।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে নিয়মিত
দুধের বোতল দিয়ে যাবে গাড়ি
কিন্তু সে দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়ো বিষ
তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পড়ে থাকবে শাদা ইঁদুর
তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা
তার রঙ হবে মারাত্মক রকম লাল
তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার-শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে
মধ্য রাতে কাপড়-চোপড়।
তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে
ছুটে পালাবে
ছুটবে
ছুটতে ছুটতে তুমি নিচতলার জানালার একখণ্ড পর্দার
মতো আটকে যাবে বার বার
তুমি ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর
কিন্তু মৃতশহর শাণিত ক'রে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি
তারার ভিতর থেকে সারারাত ধরে খ'সে পড়বে চূন
হঠাৎ লক্ষ লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতংকিত মোড়ে মোড়ে
দেখবে শাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তাল গাছের মতো
তার হাত দুটো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো
চোখের লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে
বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী
তার মাথার ফাটলে গজিয়েছে একটা বটচারা
তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল
হা-এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা বনটিয়া।
যে শহরে আমি থাকবো না সে শহরে
লিফট তোমাকে নিয়ে সোজা নেমে যাবে পাতালে
তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো
পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস

লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ
আর খুব বিকাল বেলায় তুমি ক্লান্ত হ'য়ে
ক্লান্ত হ'য়ে
ক্লান্ত হ'য়ে
ফিরবে ঘরে
কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা
তোমাকে খুলে দেবে হু-হু শীতার্ত প্রান্তর
তোমার সোফা তোমাকে বসতে দেবে না
পাঠিয়ে দেবে বিছানায়
কিন্তু বিছানা তোমাকে শুতে দেবে না
দাঁড় করিয়ে হিমশীতল জানালায়
তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত
তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপ্টা দিতেই মনে হবে
কার গলা যেন পাঠিয়ে দিচ্ছে যক্ষ্মার ফুল
তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,
দেখবে বীভৎস চিড় ধ'রে আছে আয়নায়।
সেই চিড় ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশঃ
হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ
আর তোমার মনে হবে, আমি নেই।

--------------------
২০০৭-০৩-২২
--------------------

Monday, October 22, 2007

জর্জ হ্যারিসনকে বিলম্বিত অভিবাদন

২৫ ফেব্রুয়ারি জর্জ হ্যারিসনের জন্মদিন। জীবিত থাকলে এই দিনে তাঁর বয়স হতো ৬৪। বীটলস-এর একটি গানের শিরোনাম ছিলো 'হোয়েন আই অ্যাম সিক্সটি ফোর'। চার বীটলস-এর দু'জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন 'সিক্সটি ফোর' হওয়ার আগেই। জন লেনন ৪০-এ, জর্জ হ্যারিসন ৫৮ বছর বয়সে। পল ম্যাকার্টনি ও রিংগো স্টার অবশ্য কিছুকাল আগে 'সিক্সটি ফোর' হয়েছেন।





নভেম্বর ৩০, ২০০১। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো সকালে কর্মক্ষেত্রে রওনা হওয়ার আগে এক কাপ কফি নিয়ে টিভির সামনে বসেছি। সংবাদ শিরোনামের সুন্দরী সংবাদ পাঠিকাকে গম্ভীর মুখ করে বলতে শুনলাম, ৫৮ বছর বয়সী জর্জ হ্যারিসন লোকান্তরিত হয়েছেন আগের দিন দুপুর দেড়টায়।

শুনে স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ বসে থাকি। অফিসে যাওয়ার ইচ্ছে মুহূর্তে অন্তর্হিত - খুব নিকটজনের মৃত্যুতে যেরকম হয়। পরিচয় দূরের কথা, জর্জ হ্যারিসনকে স্বচক্ষে দেখার কোনো সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি কখনো। কিন্তু আত্মার পরম আত্মীয়ই ছিলেন তিনি, অনেক বছর ধরে। আমার মতো আরো লক্ষ লক্ষ মানুষ বীটলস-এর জন লেনন, পল ম্যাকার্টনি, জর্জ হ্যারিসন ও রিংগো স্টারকে সহযাত্রী ও একান্ত আপন মানুষ ভাবতে আজও পছন্দ করেন।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি বীটলস গ্রুপটি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যায়। ইংল্যান্ডের লিভারপুলের এই চার যুবকের সম্মিলন পাশ্চাত্যের রক ও পপ সঙ্গীতের ইতিহাস-ভূগোল সব পাল্টে দিয়েছিলো। সঙ্গীত যে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রাকে, সমাজ ও রাজনীতিকে নতুন ধারায় প্রবাহিত করে দিতে পারে, তা দেখা গিয়েছিলো এই সময় থেকে। প্রথা ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী সঙ্গীত রক অ্যান্ড রোল, বীটলস তাতে যোগ করে এক নতুন মাত্রা। পাশের বাড়ির ছেলেটির মতো প্রিয়দর্শন এই চার যুবক মনোহর ও বিচিত্র সঙ্গীত সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের দুর্দান্ত রসবোধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সহজ ব্যক্তিত্ব দিয়ে সারা পৃথিবীর হৃদয় হরণ করতে সক্ষম হন।

বীটলস নামের গ্রুপটির যাত্রা শুরু ১৯৬০-এ, মারমার-কাটকাট জনপ্রিয়তা ১৯৬২ থেকে। শুরুতে তা ছিলো ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। ৬৪-তে প্রথমবারের মতো আমেরিকা যাত্রা ও বিজয়, ক্রমে সারা পৃথিবী। ১৯৭০-এ গ্রুপ ভেঙে যায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত-শ্রোতা ও সঙ্গীতপিয়াসীদের হৃদয় ভেঙে দিয়ে। দলনেতা লেনন ১৯৮০-এর 8ই ডিসেম্বরে নিউ ইয়র্কে এক উন্মাদ যুবকের গুলিতে নিহত হওয়ার পরও বহু বছর বীটলস-এর আবার একত্রিত হওয়ার আশা ভক্তদের মধ্যে জাগরূক ছিলো। বীটলস-এর তিন জীবিত সদস্য বরাবর সে সম্ভাবনা অস্বীকার করেছেন। ১৯৮৮-তে জর্জ হ্যারিসন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, "জন লেনন যতোদিন পর্যন্ত মৃত থেকে যাবেন, ততোদিন বীটলস-এর পুনর্জন্মের কোনো সম্ভাবনা নেই।" তবুও ভক্তদের আশা মরে না, জল্পনা চলতে থাকে। জর্জের তিরোধানের পরে সে অবকাশও আর থাকে না।




নিভৃতচারী জর্জ প্রথম থেকেই 'কোয়ায়েট বীটল' নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম-এ বীটলস-এর অন্তর্ভুক্তির অনুষ্ঠানে রসিকতা করে বলেছিলেন, "আমি আর কী বলবো, আমি তো কোয়ায়েট বীটল!"

১৯৯৮-এ জানানো হলো, এককালের প্রচণ্ড ধূমপায়ী জর্জ হ্যারিসন গলায় ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। ৯৭-এ অস্ত্রোপচার করে ফুসফুসের খানিকটা কেটে বাদ দিতে হয়েছিলো। গলার ক্যানসার সেরে গেলেও ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে নিজের বাড়িতে মানসিক রোগী এক উদভ্রান্ত মানুষের ছুরিতে আহত হলেন, স্ত্রী অলিভিয়া দ্রুত তৎপরতায় আক্রমণকারীকে আঘাত করলে জর্জের প্রাণ রক্ষা পায়। ছুরির আঘাত তাঁর ফুসফুসে পৌঁছে গিয়েছিলো। সুস্থ হয়ে উঠলেও ২০০১-এ গোড়ার দিকে ক্যানসারের প্রত্যাবর্তন - এবার ফুসফুসে, সঙ্গে ব্রেন টিউমার। জর্জ এবার পরাজিত হলেন। মৃত্যুই শেষ সত্য, রক অ্যান্ড রোল সঙ্গীতের বিশ্বজয়ী তারকাকেও সে রেহাই দেয় না।

বীটলস-এর কনিষ্ঠতম সদস্য জর্জ হ্যারিসনের জন্ম ১৯৪৩-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি। বাবা ছিলেন বাস ড্রাইভার। লিভারপুলের ডাভডেল প্রাইমারি স্কুলে ছিলেন জন লেননের দুই ক্লাস নিচে এবং পরে লিভারপুল ইনসটিটিউটে পল ম্যাকার্টনির এক ক্লাস নিচে। জর্জের সাত বছর বয়সে মা কিনে দিয়েছিলেন একটি গীটার। পল ম্যাকার্টনির সঙ্গে একই বাসের যাত্রী হিসেবে পরিচয়, তখন জর্জের বয়স তেরো। বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি, দু'জনেই যে একটি করে গীটারের মালিক। পল ইতোমধ্যেই জন লেননের সঙ্গে কোয়্যারিম্যান নামে একটি গানের গ্রুপের সদস্য, জর্জকে নিয়ে গেলেন তিনি জনের কাছে। গীটারে দক্ষতার সুবাদে অবিলম্বে জর্জও গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হলেন। এই গ্রুপটিই ১৯৬০ সালে বীটলস নাম ধারণ করে। তার পরের কয়েক বছরের ইতিহাস সঙ্গীতে ক্রমাগত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার নতুন নতুন শীর্ষে আরোহন।

শেষ পর্যন্ত কাল হলো অভূতপূর্ব এই জনপ্রিয়তাই - ব্যক্তিগত জীবন বলতে আর কিছু থাকলো না, ভক্তরা পারলে তাঁদের টুকরো টুকরো করে ভাগাভাগি করে নেয়। এঁদের জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাও সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় এবং ভক্তরা তা গোগ্রাসে খায়। দূর থেকে এক নজর দেখতে পেলেই কারো জন্ম সার্থক হয়ে যায়, উন্মত্ত আবেগে কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এই অভাবিত জনপ্রিয়তা এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। একসময় এমন হয় যে, উন্মুক্ত কনসার্টে ভক্তদের সোল্লাস চিৎকারে গান চাপা পড়ে যেতে থাকে - কি গাইছেন, তা-ও নিজের কানে তাঁরা শুনতে পান না। এভাবে আর যা-ই হোক, গান গাওয়া চলে না।

১৯৬৬-তে তাঁরা প্রকাশ্য কনসার্ট বন্ধ করতে বাধ্য হলেন, এরপর তাঁদের যাবতীয় গান অ্যালবাম আকারে বাজারে আসতে থাকে। একত্রে এই চারজনকে আর কোনোদিন মঞ্চে দেখা যায়নি। দিনরাত্রি এই নিরাপত্তার ঘেরাটোপের মধ্যে হাঁপিয়ে ওঠেন চার যুবক, নিজেদেরই অজান্তে তৈরি করা গণ-উন্মাদনার শিকার তাঁরা। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের নিয়ে থাকতে থাকতে তাঁরা ক্লান্ত হয়ে উঠলেন একসময় - ব্যক্তিত্বের সংঘাত, রেষারেষির শুরু হয়। ১৯৭০-এ বীটলস ভেঙে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ভক্তদের হৃদয় বিদীর্ণ হয়। পরবর্তীকালে চারজনই একক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বিপুল সাফল্য পেয়েছিলেন।

বীটলস ভেঙে যাওয়ার পর পুরো সত্তর দশকটি একক সঙ্গীতকার হিসেবে জর্জ হ্যারিসনের সাফল্যের কাল। একের পর এক সফল অ্যালবাম করেছেন - তিনটি প্ল্যাটিনাম (দশ লক্ষাধিক বিক্রিত কপি) এবং আটটি গোল্ড (পাঁচ লক্ষাধিক বিক্রিত কপি)। প্রথমটি ছিলো বীটলস যুগে রচিত ও অব্যবহৃত গানগুলি নিয়ে তিনটি ডিস্ক-সম্বলিত 'অল থিংস মাস্ট পাস' যা জর্জকে একক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। জন লেননের মৃত্যুর পর তাঁকে নিবেদন করলেন একটি অ্যালবাম 'অল দোজ ইয়ারস এগো'। তারপর কিছুটা নিষ্ক্রিয়, ৮৭-তে আবার একটি সফল অ্যালবাম - 'ক্লাউড নাইন'। ৮৯-তে বব ডিলান, টম পেটি, রয় অরবিসন, জেফ লিন ও জর্জ হ্যারিসন একত্রিত হয়ে 'ট্র্যাভেলিং উইলবেরি' নামে এক গ্রুপ তৈরি করেন। এই গ্রুপের অ্যালবাম বিপুল সাফল্য পায়। অতঃপর আবার আড়ালে চলে যান জর্জ। মৃত্যুর আগে একটি অ্যালবাম তৈরি করছিলেন, অসমাপ্ত রেখেই চলে যেতে হলো তাঁকে।




জর্জ হ্যারিসনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো, "আপনি বীটলস-এর একজন না হলে জীবনে কি হতেন?" জর্জের জবাব, "আমার বোধ-বুদ্ধি হওয়ার বয়স থেকেই তো আমি বীটল। সুতরাং আমার পক্ষে অনুমান করাই সম্ভব নয়, বীটল না হয়ে আমি আর কী হতে পারতাম!"

আরেকবার বলেছিলেন, "আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ঘটনা ছিলো বীটলস-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া। আর দ্বিতীয়টি হলো, বীটলস থেকে বেরিয়ে আসা।"

প্রকাশ্য কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়ার পর জর্জ হ্যারিসন ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শনে আকৃষ্ট হন, এই অনুরাগ আমৃত্যু অটুট ছিলো। এই সময় তিনি সেতারে রবি শংকরের কাছে দীক্ষা নেন। জর্জের আগ্রহ ও প্ররোচনায় বীটলস-এর অবশিষ্ট সদস্যরা এবং আরো অনেক রকশিল্পী ও সেলিব্রিটি ভারতে যান প্রাচ্য মিস্টিসিজম-এর টানে। এর প্রত্যক্ষ ফল ছিলো, বীটলস-এর 'নরওয়েজিয়ান উড', 'উইদিন ইউ, উইদাউট ইউ'-সহ বেশ কয়েকটি গানে সেতার ও অন্যান্য ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মিশ্রণের সফল নিরীক্ষা। বীটলস-এর গানের শব্দচয়নে 'জয় গুরুদেব' এবং পরবর্তীতে একক শিল্পী হিসেবে হ্যারিসনের গানে 'হরে রাম হরে কৃষ্ণ' এইসব অনায়াসে ঢুকে পড়েছে। আরো পরে লেননের একটি গানের শিরোনাম হয় 'ইনস্ট্যান্ট কর্ম'।

জর্জ হ্যারিসনের চরিত্র ছিলো অন্তর্মুখী, কিছুটা রহস্যাবৃত থাকতেই ভালোবাসতেন। জন লেনন একবার বলেছিলেন, "জর্জ নিজে কোনো রহস্য নয়, কিন্তু ওর ভেতরে তো অনন্ত রহস্য।"

১৯৭৪-এ নিজস্ব রেকর্ড কোম্পানির নাম দিলেন 'ডার্ক হর্স'। বলতেন, "যে ঘোড়াটি পেছনে থেকে অকস্মাৎ তীব্র গতিতে আর সবাইকে পেছনে ফেলে রেস জিতে যায়। আমার মনে হয়, সেটাই আমি।"

বীটলস-এর তুমুল জনপ্রিয়তার সময়ে জর্জ বিয়ে করেছিলেন, স্ত্রীর নাম প্যাটি। কিছুকাল পরে হ্যারিসনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন _ এরিক ক্ল্যাপটন - প্যাটির প্রেমে পড়েন, তাঁকে উদ্দেশ করে রচিত হয় ক্ল্যাপটনের বিখ্যাত গান 'লায়লা'। জর্জের সঙ্গে প্যাটির বিচ্ছেদ হলে এরিক ক্ল্যাপটন তাকে বিয়ে করেন, জর্জ নিজে সেই বিয়েতে উপস্থিত থাকেন। ক্ল্যাপটনের সঙ্গে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত হ্যারিসনের বন্ধুত্ব অটুট ছিলো। হ্যারিসন ১৯৭৭-এ বিয়ে করেন অলিভিয়াকে, তাঁদের একমাত্র পুত্রের নামেও ভারতীয় ছাপ - ধ্বনি হ্যারিসন।

জর্জ হ্যারিসনের চরিত্রে বৈপরীত্যও ছিলো। শান্তশিষ্ট স্বল্পভাষী বলে পরিচিতি পেলেও ঘনিষ্ঠদের সান্নিধ্যে প্রচুর কথা বলতেন। একজন তো বলেছিলেন, "ওকে থামাবে কে!" আপাত-বিষণ্ণ মানুষটি আচমকা চমকপ্রদ রসিকতায়ও পটু ছিলেন। দার্শনিকতায় আগ্রহী হয়েও গাড়ির রেসিং পছন্দ করতেন। তিনি এমন একজন রক-তারকা যিনি বাগানে সার ছড়িয়ে বেশি আনন্দ পেতেন। তাঁর আত্মজীবনী 'আই, মি, মাইন'-এর উৎসর্গে লিখলেন : "যেখানে যতো বাগানবিলাসী আছে, তাদের সবার উদ্দেশে।"

নিজের জীবনদর্শনটির সারাংশ তিনি এইভাবে বিবৃত করেছিলেন, "আমার মনে হয় প্রকৃত সঙ্গীত যাদের জীবনের সর্বস্ব তারা পৃথিবীকে উদ্দেশ করে বলতে পারে, 'আমার ভালোবাসা তুমি গ্রহণ করো, আমার হাসি ও আনন্দটুকু নাও। যা কিছু অসুন্দর সেগুলোকে সরিয়ে রাখো একপাশে, ওসবে তোমার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু আমার সঙ্গীতের শুদ্ধতা ও সুন্দরটি তুমি নাও, কারণ সেটিই খাঁটি ও সর্বোৎকৃষ্ট, এবং এটুকু্ই আমি স্বেচ্ছায় ও সানন্দে বিলিয়ে দিতে পারি'।"




বীটলস একত্রিত থাকার কালে জন লেনন ও পল ম্যাকার্টনির মতো অতিকায় প্রতিভার আড়ালে পড়ে ছিলেন জর্জ হ্যারিসন। নিয়ম অনুযায়ী একেকটি গানের রচয়িতা মূলত গানটি গাইবেন, বাকিরা তাতে সহায়তা ও সঙ্গত দেবেন। লেনন-ম্যাকার্টনির বিপুল সৃষ্টি-উৎকর্ষতার কারণে জর্জের রচনা প্রায়শই বাদ পড়ে যেতো। এ নিয়ে তাঁর খেদ ও দুঃখ ছিলো, তা গোপনও করেননি। বীটলসের একটি অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত তাঁর 'হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলি উইপস'-এ তা স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছিলো। সেই উৎকর্ষতা জর্জ ক্রমাগত চর্চা ও চেষ্টায় অর্জন করেছিলেন। বীটলস যুগের তাঁর আরো স্মরণীয় গানগুলির মধ্যে আছে মিষ্টি ও মন-ভালো-করা 'হিয়ার কামস দ্য সান',
'সামথিং' (এই গানটিকে ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের গান বলে বহুবার উল্লেখ করেছেন)। গীটারবাদনের দক্ষতায় হ্যারিসনের চেয়ে উৎকৃষ্ট তাঁর সমসাময়িক অনেকেই ছিলেন, কিন্তু তাতে তিনি এমন সুন্দর মিষ্টি ও হৃদয় মন্থন করা একটি আবেশ রচনা করতেন যা তুলনারহিত। ওপরে উল্লিখিত দুটি গান ছাড়াও এর উদাহরণ আছে 'লেট ইট বি', 'অল ইউ নীড ইজ লাভ' এবং আরো অসংখ্য গানে।

মাত্র কয়েক বছরে বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃজনশীলতায় বীটলস একটি প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ষাটের দশকে সারা পৃথিবীতে যে অস্থিরতা ও বিদ্রোহ এবং একই সঙ্গে হিপি আন্দোলনের মতো চরম বৈরাগ্যের সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে, বীটলস তারই এক প্রতীক ও প্রতিভূ, অনুঘটক ও অংশীদার। সেই আচ্ছন্নতার রেশ আজও রয়ে গেছে ওই প্রজন্মের জীবিতদের মধ্যে। বীটলস-এর নামে তাঁরা আজও উদাস হয়ে যান, স্মৃতিতাড়িত হন। এমনকি এখনকার নবীন বয়সী যাদের স্মৃতিতাড়িত হওয়ার সুযোগ নেই, তারাও বিস্ময়-বিহ্বলতা নিয়ে বীটলস শোনে। ফলে, জর্জের মৃত্যুতে সব ধরনের মানুষের যে স্বজন বিয়োগের প্রতিক্রিয়া হয় তা অপ্রত্যাশিত লাগে না।

প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পল ম্যাকার্টনি বললেন, "জর্জ ছিলো আমার ছোটো ভাইয়ের মতো। ... মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম, অসুখ-বিসুখ সব ভুলে সে যথারীতি হাসিঠাট্টা করে গেলো, কোথাও বিষাদের চিহ্নমাত্র নেই। খুব সাহসী ও বড়ো হৃদয়ের মানুষ না হলে এটা পারা যায় না।"

বিখ্যাত আইরিশ ব্যান্ড ইউটু সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা পোষণ করতেন না জর্জ, তা গোপনও করেননি। ইউটু-র প্রধান পুরুষ বনো-র তা অজানা ছিলো না। ৯৯-এ জর্জ আততায়ীর হাতে ছুরিকাহত হলে বনো বলেন, "মানুষটি আশ্চর্য গীটারবাদক ও সঙ্গীতরচয়িতা। মিলেনিয়াম উৎসবে লিংকন মেমোরিয়ালে আমাদের নিজস্ব একটি গান গাইতে গাইতে একসময় অবলীলায় জর্জের 'মাই সুইট লর্ড' গাইতে শুরু করি। এই মানুষটিকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, যদিও আমি নিশ্চিত নই অনুভূতিটি পারস্পরিক কি না।"

বব ডিলান বললেন, "জর্জ ভালোবাসা উস্কে দিতে জানতো, তার ছিলো একশো মানুষের সমান মানসিক শক্তি। সে ছিলো সূর্য, ফুল ও চাঁদের মতো, তার অভাব আমরা অনুভব করতে থাকবো দীর্ঘদিন ধরে। তার অনুপস্থিতিতে পৃথিবী নিদারুণভাবে শূন্যতর হয়ে গেলো।"

বব গেলডফ বলছেন, "জর্জ নিজেই বলতো, জন ও পলের বিশাল প্রতিভার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কীভাবে সম্ভব? কিন্তু আমার তো মন হয়, সে তা দিয়েছে এবং ভালোভাবেই।"

জন লেননের বিধবা স্ত্রী ইয়োকো ওনো বলেন, "তার জীবন ছিলো ম্যাজিকাল এবং আমার মনে হয় তার সান্নিধ্যে আসার ফলে আমাদের জীবনেও তার কিছু ছায়া পড়েছিলো।"

জন লেনন নিহত হওয়ার পর নিউ ইয়র্কে সেন্ট্রাল পার্কের একটি অংশের নামকরণ করা হয় স্ট্রবেরি ফিল্ড, লেননের একটি গান থেকে নেওয়া হয় নামটি। জর্জের মৃত্যুর খবরে পিট ডেগ্যান নামের এক ভক্ত ভোরের আলো ফোটার আগেই স্ট্রবেরি ফিল্ডে চলে এসেছেন। তাঁর মতে "আজকের দিনটি রক অ্যান্ড রোলের ভক্তদের জন্যে খুব দুঃখের দিন।"

স্ট্রবেরি ফিল্ড-এ আরো অনেক ভক্ত সমবেত হয়েছিলেন। এঁদের একজন, স্টিভ ইয়ালপ, পার্কে জগিং করতে এসে থমকে দাঁড়ালেন। জর্জের 'হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলি উইপস' গানটির প্রসঙ্গ টেনে বললেন, "আজ আমি কাঁদছি, আর কাঁদছে আমার গীটার।"

৪২ বছর বয়স্ক জো ক্যানিন তিন দশক ধরে বীটলস-এর অনুরাগী, বলতে গেলে বীটলসকে সঙ্গী করেই বড়ো হয়েছেন। তাঁর প্রতিক্রিয়া: "আমাদের সবারই বয়স বাড়ছিলো। জর্জের প্রস্থানের সময়টি হঠাৎই এলো আর আমাদের মনে পড়ে গেলো, সব সুন্দরই বিলীন হয় মৃত্যুতে।"

হুয়ান মাহদালানি নামের এক আর্জেন্টিনীয় ভক্ত লিখছেন, "বীটলসদের আমি কখনো চাক্ষুষ দেখিনি, অথচ তাদের কাছে কী অপরিমেয় আমার ঋণ! তাদের সঙ্গীত আমার প্রতিটি নিশ্বাসে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমি নিজের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি করে নিয়েছি, তাদের সুরকে আমার নিজেরই সুর বলে জেনেছি। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, তারা যে কোনো ধর্মগুরুর চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলো আমার প্রজন্মকে। বিদায় জর্জ, আমি জানি এখন তুমি সূর্যের অনেক কাছাকাছি।"

আরেকজন লিখেছেন, "জর্জ, যে গীটারে আমি তোমার গান তুলেছি, সেই গীটার কেঁদে যাবে বাকি জীবন। তোমার মৃত্যুতে আমি আজ এক আত্মার সঙ্গীকে হারালাম, যদিও তুমি তা কখনো জানোনি।"

জর্জ হ্যারিসনের অনুরাগীদের এই ধরনের আরো কিছু মন্তব্য :

: "তুমি নেই, কিন্তু তোমার গান বেঁচে থাকবে। কী আশ্চর্য সুন্দর একজন মানুষ ছিলে তুমি, আশ্চর্য একজন গায়ক, সঙ্গীতরচয়িতা ও গীটারবাদক। তোমার অভাব আমাকে পীড়িত করবে। এই মুহূর্তে আমি চুপ করে বসে প্রাণভরে কাঁদতে চাই।"

: "একমাত্র ভালো যা হলো তা ওই যন্ত্রণা ও কষ্টের অসুখটি তোমাকে আর স্পর্শ করতে পারবে না। স্বর্গে অপেক্ষমাণ জন লেনন এতোদিনে একজন বন্ধুকে ফিরে পাবে, হয়তো দু'জনে মিলে কিছু সঙ্গীত রচনাও সম্ভব হয়ে উঠবে। আমাদের কাছে তা কখনো পৌঁছবে না, এই যা দুঃখ।"

: "আজ ভোরে আমার অ্যালার্ম রেডিওতে 'হিয়ার কামস দ্য সান' শুনে ঘুম ভাঙলো। রেডিও স্টেশনটি অলটারনেটিভ গানের, জর্জ হ্যারিসনের গান সেখানে বাজার কথা নয়। তক্ষুণি বুঝে ফেলি, জর্জ চলে গেলো। তার গান শুনতে শুনতে আমি বড়ো হয়ে উঠেছি, কতো স্মৃতি জড়ানো আছে সেইসব গানের সঙ্গে। তার গান আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে এবং তার বিদায়ে, সীমাহীন আশাবাদী ও অসাধারণ মুক্তচেতনার মানুষটির অভাবে পৃথিবী আমার কাছে এখন বিষণ্ণতর বলে প্রতিভাত হচ্ছে। আমি তোমাকে মিস করছি, জর্জ।"

: "আজ ভোর ছ'টায় মা ঘুম ভাঙিয়ে যখন জানালো আমার আইডল আর নেই, আমার মন-খারাপের আর অবধি রইলো না। ক্লাসে গিয়ে আমি বন্ধুদের সামনেই কেঁদে ফেললাম। এই লেখার সময়ও আমি শোকগ্রস্ত। জর্জ ঠিকই বলেছিলো, সবকিছুকেই চলে যেতে হবে। হয়তো আমাদের শোকও একসময় প্রশমিত হবে। কিন্তু আমার এবং আমার মতো অনেকের জীবনে যে প্রভাব সে বিস্তার করেছিলো তা কখনো বিলীন হবে না।"

: "আমেরিকায় বীটলম্যানিয়ার যখন শুরু, আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। বলাই বাহুল্য বীটলস-এর গানের সঙ্গে সঙ্গে শুধু নয়, তাদের কালচারের সঙ্গে বড়ো হয়ে উঠেছি আমি। এইসব আমাদের নবীন জীবনকে কী ভীষণভাবে আচ্ছন্ন করেছিলো। জর্জের মৃত্যুর খবর শুনে আমি এবং আমার স্ত্রী পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। যেন আত্মীয়বিয়োগ ঘটেছে আমাদের। জর্জ ছিলো আমার প্রিয়। আমি শখের বশে গীটার বাজিয়ে এখানে-ওখানে গান করি। আমি জানি, আমার পরবর্তী অনুষ্ঠানে অবশ্যই 'নরওয়েজিয়ান উড', 'সামথিং' এবং 'হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলি উইপস' (যা এখন আমার প্রকৃত অনুভূতি) গাইবো।"

: "জন লেনন নিহত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে আমার জন্ম। আমার বয়স একুশ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে আমি আরেকজন বন্ধু জর্জকে হারালাম। জর্জ আমার সবচেয়ে প্রিয় বীটল। আমার মনে আছে, ছোটোবেলায় বিছানা গোছানোর সময় আমি আমার মা-র সঙ্গে সঙ্গে জর্জের 'সিক্রেট' গানটি গাইতাম। পরে বড়ো হতে হতে বীটলস-এর অসাধারণ গানগুলি আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। জর্জের গীটারের ধ্বনির মতো মিষ্টি আর কিছু হয় না। ভালো থেকো, প্রিয় বন্ধু আমার।"

: "বীটলস-এর সঙ্গে যারা বড়ো হয়ে ওঠেনি তাদের পক্ষে অনুমান করা অসম্ভব যে ওই চারজন আমাদের প্রজন্মের কাছে কতোখানি ছিলো, কী ছিলো। আরেকজন বীটল-এর মৃত্যু আমাদের যৌবনকালটিকে ক্ষণিকের জন্যে ফিরিয়ে আনে এবং এই অনুভবের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় - জীবন কতো ছোটো। আজ বড়ো বিষাদগ্রস্ত আমি। জীবন তবু থেমে থাকে না। বীটলস-এর গান আমাদের সারাজীবনের অংশ হয়ে থাকবে।"

: "প্রিয় জর্জ, কী বলবো আমি? আমার বাবা তোমার অসুস্থতার খবর জানিয়েছিলেন, যেমন তিনি বরাবর তোমাদের কথা বলতেন এবং যা শুনতে শুনতে আমি বীটলস ভালোবেসে বড়ো হয়ে উঠেছি। আমি তো জানতামই, একদিন এরকম একটি খবর আমাকে শুনতে হবে। তবু আজ সকালে বাবা যখন ফোন করে জানালেন তুমি নেই, আমার কান্না আর থামে না। জানো, তুমি সম্ভবত আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে? একসময় আমি ভীষণ মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। সেই সময় আমি তোমার অসুস্থতার খবর পাই। পত্রিকায়, ইন্টারনেটে তোমার খবর পড়ি আর মনে হয়, তুমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছো, আর আমি তাকেই আলিঙ্গন করার চিন্তা করছি। তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি জর্জ, আমি আমার এই মৃত্যুচিন্তাকে দূর করে দেবো। এই মুহূর্তে আমি তোমার গান শুনতে শুনতে লিখছি আর কাঁদছি। জানি, পৃথিবীজুড়ে আরো অনেক মানুষই তা করছে। মনে পড়ে, ১৯৮০ সালে জনের মৃত্যুর সময় আমরি বয়স ছিলো দশ। তার জন্যেও আমি কেঁদেছিলাম। অনেকে বুঝতেই পারছিলো না, যে মানুষটিকে আমি কোনোদিন দেখিনি, চিনিনি তার জন্যে আমি কেন কাঁদছি। কিন্তু জানো, তুমি, জন, পল আর রিংগো আমার জীবনের অংশ হয়ে আছো! আরো জানতে চাও? তোমাদের চারজনের কারণেই আমি ইংরেজি শিখেছিলাম, এখন ইংরেজি পড়াই আর ক্লাসে তোমাদের গানের কথা ছেলেমেয়েদের বলি অনবরত। আমি ইংল্যান্ডে গিয়ে বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলাম তোমাদের লিভারপুল শহরে। তোমরা যেখানে ছিলে এবং আরো সব জায়গা যা তোমাদের স্মৃতি ধরে রেখেছে - সেইসব ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তোমাদের অনুভব করতে চেয়েছি। তোমাদের একটি অ্যালবামের নাম ধার করে বলতে পারি, আমার জন্যে সেটি ছিলো এক 'ম্যাজিকাল মিস্টেরি ট্যুর', সে এক আশ্চর্য স্বপ্নসম্ভব। প্রিয় জর্জ, প্রিয় বন্ধু আমার, তোমাকে বোঝাতে পারবো না, কী বেদনা আমি অনুভব করছি আজ। আমার হৃদয়ে তোমার জন্যে একটি বিশেষ জায়গা সারাজীবন থাকবে, জনের জন্যে যেমন আছে। আজ আমাকে ঘরে থাকতে হবে, আজ আমি কাজে যাবো না। কিচ্ছু করবো না। বিদায়, প্রিয় বন্ধু।"




কারিন নামের জর্জ হ্যারিসনের এক ভক্ত জানাচ্ছেন, "আমার তখন আট বছর বয়স, আমার বড়ো বোনের বারো। সে যা যা করতো আমাকেও তা-ই করতে হবে। এইভাবেই আমার বীটলস-এর গানের সঙ্গে পরিচয়, আমি লুকিয়ে আমার বোনের বীটলস অ্যালবামগুলি শুনতাম। গানগুলো আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। বীটলস-এর ভাঙন আমাকে যেন একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়ে গেলো। কিন্তু আমি জর্জের প্রেমে পড়ে গেলাম ১৯৭১-এ 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর সময়। তখন আমি পনেরো বছরের।"

জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দেশটির জন্মের সময় থেকে। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে অগাস্ট মাসে রবি শংকরের আগ্রহে জর্জ হ্যারিসন একটি কনসার্টের মাধ্যমে যুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্যে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। আজকাল মানবিক ইস্যুতে বেনিফিট কনসার্টের আয়োজন হরহামেশা হয়ে থাকে। কিন্তু ১৯৭১-এর অগাস্টে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেনে এই ধরনের কনসার্ট সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিলো 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নামে। বাংলাদেশ সেই ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গেলো। এই কনসার্টের ফলেই পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশকে জানলো। সন্দেহ নেই, জর্জ হ্যারিসনের বিশ্বব্যাপী তারকা-খ্যাতি এই আয়োজনে ও তার সাফল্যে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছিলো।

২০০৫-এ 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' প্রথমবারের মতো ডিভিডি-তে প্রকাশ করা হয়েছে। সঙ্গে নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে অ্যালবামটিও। মৃত্যুর আগে হ্যারিসন এটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সমাপ্ত দেখে যেতে পারলেন না। কাজটি সম্পন্ন হলো স্ত্রী অলিভিয়া ও পুত্র ধ্বনির উদ্যোগে। রবি শংকর এ উপলক্ষে লিখেছেন :

"আমি আনন্দিত যে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নতুন করে মুক্তি পাচ্ছে। বাংলা অঞ্চলের মানুষ হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্যে আমার টান তো ছিলোই। তার ওপরে সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহারা শরণার্থী ও শিশুদের সাহায্যের জন্যে কিছু একটা করার তাগিদ আমার স্বাভাবিকভাবেই ছিলো।

"জর্জ হ্যারিসনকে বিষয়টি জানালাম। সে আমার অন্তরের আকুতি ও উদ্বেগটি সে বুঝলো এবং একটি কনসার্টের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হলো। বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিলো তাতে। আমার প্রিয় জর্জের সহায়তা ছাড়া তা কিছুতেই সম্ভব হতো না। যা ঘটেছিলো, তা এখন ইতিহাস। এটি গত শতাব্দীর সবচেয়ে তীব্র ভাবাবেগপূর্ণ সঙ্গীত-অভিজ্ঞতাগুলোর অন্যতম।

"অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন কোনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কনসার্ট। উত্তরটি আমার জন্যে কঠিন, কারণ পঁচাত্তর বছরের বেশি সময় ধরে সঙ্গীত পরিবেশন করে আসছি আমি। কিন্তু 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' খুবই উল্লেখযোগ্য আমার জন্যে। এর ধারণাটি আমার উদ্ভাবন এবং কনসার্টটি করা হয় আমার আত্মার কাছাকাছি সব মানুষদের সাহায্যের জন্যে, এর মধ্যে আমার অনেক দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনও নিশ্চয়ই ছিলেন। কনসার্টের প্রথম অংশে আলী আকবর খান ও আল্লারাখা খান মঞ্চে উঠেছিলেন আমার সঙ্গে। দ্বিতীয় অর্ধে জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে ছিলেন বব ডিলান ও এরিক ক্ল্যাপটন। সবশেষে জর্জ এই উপলক্ষে তার লেখা 'বাংলাদেশ' গানটি পরিবেশন করে।

"এর ফলে রাতারাতি সারা পৃথিবী বাংলাদেশ নামের দেশটির কথা জানলো। লক্ষ লক্ষ ডলার ইউনিসেফের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হলো। এই ঘটনা যে বিস্মৃত হওয়ার নয়, এ আমার পরম পরিতৃপ্তি। এটি জেনেও ভালো লাগছে যে এই ছবি এবং অ্যালবামটি নতুন করে প্রচারিত হচ্ছে। আমি নিশ্চিত ১৯৭১-এর এই সাড়া-জাগানো কনসার্টটি আজকের শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করবে।"




আমেরিকায় বাংলাদেশের পরিচিতি খুব বেশি নেই। অধিকাংশ মানুষ নামও শোনেনি দেশটির, কেউ কেউ আজও জিজ্ঞাসা করে বাংলাদেশ জায়গাটা ঠিক কোথায়? অপেক্ষাকৃত বয়স্করা বাংলাদেশকে জানে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'-এর কারণেই। তাদের কাছে বাংলাদেশ এবং জর্জ হ্যারিসন এক স্মৃতিময় ব্যঞ্জনার সমার্থক। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জন্যে হ্যারিসন যে কতোটা করেছিলেন, তার বিচার আমরা কোনোদিন করিনি। শত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যা করা সম্ভব হতো না, দুটি মাত্র কনসার্ট করে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি।

সেই প্রথম পৃথিবীর মানুষ জানলো, বাংলাদেশ নামে একটি দেশের অভু্যদয় ঘটছে, তারা স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধ করছে, সে দেশটিতে নির্বিচার গণহত্যা ও নারীলাঞ্ছনার ঘটনা ঘটছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশছাড়া হয়েছে। জর্জের উদ্যোগ ও অংশগ্রহণ ছাড়া এটি এতো দ্রুত ঘটানো কিছুতেই সম্ভব হতো না। যতোদূর জানি, ওই একবারই জর্জ হ্যারিসন তাঁর তারকাখ্যাতি ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করেছিলেন এবং তা করেছিলেন বাংলাদেশের জন্যেই।

অথচ বাংলাদেশ তাঁকে মনে রাখেনি, ধন্যবাদ জ্ঞাপনটিও করেনি। তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এমনকি, তাঁকে বাংলাদেশে আসার জন্যে কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, এমন কথাও কখনো শুনিনি। আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধের যথার্থ নমুনা বটে। রাষ্ট্রীয়ভাবে না পারি, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে স্মরণ করবো। মনে মনে আমাদের অক্ষমতা ও অকৃতজ্ঞতার জন্যে মার্জনা চাইবো।

এই সেদিন ট্র্যাভেলিং উইলবেরি-র অ্যালবামে 'হ্যান্ডল মি উইথ কেয়ার' গানে জর্জের গীটারবাদন শুনতে শুনতে আচমকা মনে হলো, শুধু বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে এমন হৃদয় নিংড়ে নেওয়া আবেদন যিনি সৃষ্টি করতে জানেন, তাঁকে মরে যেতে হয় কেন? আমাদের মতো অকিঞ্চিৎকরদের আয়ু সঞ্চারিত করেও যদি এই ধরনের সৃষ্টিশীল মানুষদের অমর করে দেওয়া যেতো!

-------------------
২০০৭-০২-২৩
-------------------

রোযা পার্কস : অনিবার্য আন্দোলনের অনিচ্ছুক প্রতীক

পঞ্চাশের দশকে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের একটি প্রধান চরিত্র রোযা পার্কস-এর নাম খুব বেশি পরিচিত নয়। আজকের মাইকেল জ্যাকসন, মাইকেল জর্ডান বা ওপরা উইনফ্রি যেমন ঘরে ঘরে পরিচিতি নাম, রোযা পার্কস-এর পরিচিতি সে তুলনায় কিছুই নয়। অথচ একজন রোযা পার্কস বিহনে এই কৃষ্ণাঙ্গ তারকাদের আজকের পর্যায়ে আসা অসম্ভবই হতো। কিন্তু খ্যাতি তিনি চাননি, অনেকটা অনিচ্ছায় এবং ঘটনাক্রমে এই আন্দোলনের অনুঘটক ও প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর, সন্ধ্যাকাল। অ্যালাবামা রাজ্যের মন্টগোমারি শহরে ক্লীভল্যান্ড অ্যাভিন্যুতে বাসে উঠেছেন ৪২ বছর বয়সী রোযা পার্কস। সারাদিনের কাজের শেষে ক্লান্ত শরীরে বাসে উঠে বসেছেন। মাঝের দিকের সারিতে বসা রোযার সঙ্গে আরো তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ, দু'জন মহিলা ও একজন পুরুষ। বাসচালক একজন সাদা যাত্রীর জন্যে তাদের আসন ছেড়ে দিতে বলে। অন্য তিনজন উঠে গেলেও রোযা ঠায় বসে থাকেন। বাসচালক জিজ্ঞেস করে, 'কী হলো, তুমি উঠবে না?'

সংক্ষিপ্ত উত্তর আসে, 'না।'

'আমাকে তাহলে পুলিশে খবর দিতে হবে।'

'তা তুমি অনায়াসে করতে পারো।' রোযা পার্কস-এর নির্বিকার ও দৃঢ় জবাব।

পঞ্চাশের দশকের অ্যালাবামায় একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পক্ষে এই অস্বীকৃতি অকল্পনীয়। মন্টগোমারি শহরের বাসযাত্রীদের ৭৫ ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ, অথচ আইন অনুযায়ী পাশাপাশি বসা দূরে থাক, বাসের প্রথম চারটি সারিতে তারা বসতে পারবে না, সেগুলি সংরক্ষিত থাকবে শুধুমাত্র সাদা চামড়ার মানুষদের জন্যে। প্রয়োজনে সাদারা মাঝের সারিগুলিরও দখল নিতে পারবে, তখন কালোরা আরো পেছনে সরে বসবে। বসার জায়গা না পেলে দাঁড়িয়ে থাকবে অথবা নেমে যাবে। শুধু তাই নয়, সাদারা সামনের সারিতে বসে থাকা অবস্থায় কালো যাত্রীরা সামনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে শুধুমাত্র টিকেট কেনার জন্যে। তারপর নেমে যেতে হবে এবং পেছনের দরজা দিয়ে তারা বাসে উঠবে, কিন্তু কোনোক্রমেই সাদা যাত্রীদের পাশ কাটিয়ে যাওয়া চলবে না।

কৃষ্ণাঙ্গ বাসযাত্রীরা ওই বৈষম্যমূলক আইনের প্রতিবাদ দীর্ঘকাল ধরে করেছে। রোযা পার্কসও ব্যতিক্রম ছিলেন না, 'ওই গ্রেফতারের ঘটনা থেকেই প্রতিবাদের সূচনা হয়নি, মন্টগোমারির রাস্তায় আমাকে অনেক হাঁটতে হয়েছে।'

মানবাধিকারের উচ্চকণ্ঠ ধ্বজাধারী আমেরিকায় এমন মানবেতর ব্যবস্থা মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও ছিলো, ভাবা যায়! সাদা-কালোর ভেদাভেদ আজও আমেরিকার সমাজ ও রাজনীতিতে একটি বড়ো বিষয়, কিন্তু তার চেহারা সেই সময়ের মতো অমানবিক নয়।

১৯৪৩-এ এক বাদানুবাদের জের ধরে চালক জেমস ব্লেক বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছিলো রোযাকে। কাকতালীয় বললেও কম বলা হয়, ১৯৫৫-র ১ ডিসেম্বরে ক্লীভল্যান্ড অ্যাভিনু্যতে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাওয়া ঘটনাটির সময়ও বাসের চালক ওই জেমস ব্লেক! সেদিন রোযা পার্কসকে গ্রেফতার করা হয় পৃথকীকরণ (সেগ্রিগেশন) আইন ভঙ্গের দায়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় সিভিল রাইটস আন্দোলন সংগঠিত হয়, নেতৃত্বে চলে আসেন যুবক মার্টিন লুথার কিং, যাঁকে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ দিতে হয় ১৯৬৮ সালে।

রোযা পার্কস-এর গ্রেফতারের দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। প্রতিবাদে পরের সোমবারে মন্টগোমারির কৃষ্ণাঙ্গরা বাসে আরোহন বন্ধ করে দেয়। তারা কাজে যায় গাড়িতে আসন ভাগাভাগি করে অথবা কৃষ্ণাঙ্গ মালিকানার ট্যাক্সিতে করে। এই ট্যাক্সিচালকরা সেদিন বাসভাড়ার সমান দশ সেন্ট ভাড়ায় যাত্রীবহন করে। প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে কাজে যাতায়াত করে, অনেককে হাঁটতে হয় ২০ মাইলেরও বেশি পথ। দীর্ঘ ১৩ মাস মন্টগোমারির বাস সার্ভিস বয়কট করেছিলো তারা। অবশেষে সুপ্রীম কোর্ট বাসে কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করার আইন রদ করে। তারিখ ১৯৫৬ সালের ১৩ নভেম্বর। নাগরিক অধিকার আন্দোলন নতুন গতি পায়, যার ফলশ্রুতিতে কয়েক বছরের মধ্যে মানুষ ও নাগরিক হিসেবে কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার স্বীকৃতিলাভ করে।

সেদিনের রোযা-র অনুচ্চকিত প্রতিবাদ তাঁকে ক্রমে বর্ণবাদ রহিতকরণ আন্দোলনের অনিচ্ছুক প্রতীক-চরিত্রে পরিণত করে। ১৯৮৮ সালে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, 'সিভিল রাইটস আন্দোলনের মাতা হিসেবে আবির্ভুত হওয়ার কোনো আকাঙ্ক্ষাই আমার ছিলো না। ...আসলে ছক কেটে হিসেব কষে গ্রেফতার হওয়ার উপায় আমার ছিলো না। ...আমি সেদিন গ্রেফতার হবো বলে বাসে উঠিনি, উঠেছিলাম বাড়ি ফেরার জন্যে। সারাদিন কাজের শেষে ক্লান্তি ছিলো, তবে তা অন্যসব দিনের চেয়ে বেশি কিছু নয়।'

তাঁর নিজের ভাষ্যে জানা যাচ্ছে, কালো রঙের মানুষরা সম্পূর্ণ মানুষ নয় - এই ধরনের আদিম ধারণা ও নিয়মে ক্রমাগত অপমান একসময় সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়। নিয়মগুলির কিছু ছিলো লিখিত আইন আর কিছু বাহিত হয়ে আসা অভ্যাসের ফল। কিন্তু জীবনে একটা সময় আসে যখন প্রতিবাদ করতেই হয়। তাই তাঁকে বলতে হয়েছিলো, 'আমিও একজন পূর্ণ মানুষ ও নাগরিক। এই নিগ্রহ আমার প্রাপ্য নয়'।

মার্টিন লুথার কিং তাঁর 'স্ট্রাইড টু ফ্রীডম' বইয়ে লিখেছেন, "মিসেস পার্কস-এর এই প্রতিবাদ কেউ বুঝবে না যতোক্ষণ না এই অনুভব আসে যে একসময় সহনশীলতার পাত্রটি উছলে ছলকে পড়ে এবং মানবিক ব্যক্তিত্বটি এই বলে চিৎকার করে ওঠে, 'আমার আর সহ্য হয় না'।"

কৃষ্ণাঙ্গ নেতা জেসি জ্যাকসন বলেন, 'তিনি সেদিন বসেছিলেন বলে আমরা উঠে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। তিনি অন্তরীণ হয়ে আমাদের মুক্ত করেছিলেন।'

পরে রোযা পার্কস মিশিগ্যান রাজ্যের ডেট্রয়ট শহরে চলে যান এবং ১৯৬৫ সালে কংগ্রেসম্যান জন কনিয়ারস রোযাকে তাঁর কংগ্রেশনাল অফিসের কর্মী হিসেবে নিযোগ করার আগে পর্যন্ত সীমস্ট্রেস হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৮ সালে অবসর নেন রোযা। মৃত্যু ২১ অক্টোবর ২০০৫ ।

নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সূচনা থেকেই কৃষ্ণাঙ্গরা তাঁকে প্রায় দেবী-প্রতিমা হিসেবে দেখতে শুরু করলে রোযা অস্বস্তি বোধ করতেন। বলতেন, 'আমি শুধু আশা করেছি যুবা বয়সীরা কিছু উদ্বুদ্ধ হবে, আর কিছু নয়। আমি এমন একজন মানুষ যে সকল মানুষের স্বাধীনতা, সমতা, সুবিচার ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশী - এটুকু্ই আমার পরিচয় হোক।" রোযা পার্কস-এর চরিত্রের যে দিকটি সবচেয়ে আকর্ষক মনে হয় তা তাঁর অবিস্মরণীয় বিনয় ও সরলভাবে সত্য বিবৃত করার প্রবণতা। নিজের পাতে ঝোল টানার আগ্রহ তাঁর নেই, নিজেকে অসাধারণ প্রতিপন্ন করতেও আগ্রহী নন। নিতান্ত অনিচ্ছুক এই নারীর মতো গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হলে আমাদের নেতানেত্রীরা কী বলতেন ভাবতে ভয় হয়।

কয়েক বছর আগে তাঁর জীবদ্দশাতেই একটি আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা ঘটে। মিজৌরি রাজ্যের সেন্ট লুইস শহরে হাইওয়ের কয়েক মাইলব্যাপী একটি অংশ, যার নাম রোযা পার্কস হাইওয়ে, তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় কু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান নামের কুখ্যাত বর্ণবাদী সংগঠনটি। আমেরিকায় 'অ্যাডপ্ট আ হাইওয়ে' প্রকল্পে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন হাইওয়ের নির্দিষ্ট অংশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিয়ে থাকে। নিয়তির পরিহাস বোধহয় একেই বলে। যে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রতীক চরিত্র তিনি হয়ে উঠেছিলেন, সেই বর্ণবাদের প্রবক্তা সংগঠনের ওপর রোযা পার্কস হাইওয়ের দেখাশোনার ভার!

এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে কিছু আলোচনা হচ্ছিলো, সেই সময়ে এই রচনাটি আমার লেখার ইচ্ছে ছিলো। হয়ে ওঠেনি। লিখতে এই বিলম্বে ক্ষতি কিছু অবশ্য হয়নি। রচনাটি রোযা পার্কসকে উদ্দেশ করে নয়, তাঁকে নিয়ে লেখা।